রাজধানীর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার দুটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়কে ঘিরে ওয়েবসাইট ও গোপন টেলিগ্রাম গ্রুপের মাধ্যমে মাদক বিক্রির একটি চক্রের সন্ধান পাওয়ার দাবি করেছে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, এই চক্রের মাধ্যমে সহজেই পাওয়া যাচ্ছে কুশ ও সিনথেটিক গাঁজা। গত শুক্রবার ভাটারার একটি ফ্ল্যাটে অভিযান চালিয়ে ৩০০ গ্রাম গাঁজাসহ এক তরুণকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। জিজ্ঞাসাবাদে তিনি জানিয়েছেন, তাঁর তৈরি টেলিগ্রাম গ্রুপে দুই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় ২৫০ শিক্ষার্থী যুক্ত আছেন।
অধিদপ্তরের সূত্র জানায়, অনলাইনে মাদক কেনাবেচার এই চক্রের বেশির ভাগ সদস্যই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। তাঁরা ক্যাম্পাসে ঘুরে ঘুরে মাদকসেবী শিক্ষার্থীদের মধ্যে ‘ভিজিটিং কার্ড’ বিতরণ করেন। কার্ডে থাকে একটি কিউআর কোড। সেটি স্ক্যান করলে আগ্রহী ব্যক্তি একটি ওয়েবসাইটে পৌঁছান। সেখান থেকে তাঁকে যুক্ত করা হয় একটি গোপন টেলিগ্রাম গ্রুপে। অর্থাৎ ক্রেতা খোঁজা, যোগাযোগ ও বিক্রি, পুরো প্রক্রিয়াটিই চলছে অনলাইনে, প্রচলিত মাদকের আস্তানার বাইরে।
গত শুক্রবার সহকারী পরিচালক মোস্তাক আহমেদের নেতৃত্বে ভাটারার একটি ফ্ল্যাটে অভিযান চালানো হয়। সেখান থেকে ৩০০ গ্রাম গাঁজা ও একটি ব্যবহৃত মুঠোফোনসহ সাইম ইসলামকে (১৯) গ্রেপ্তার করা হয়। মামলার এজাহার অনুযায়ী, তাঁর বাড়ি বরিশালের বাকেরগঞ্জে। তিনি ভাটারার জোয়ার সাহারা লিচুবাগান এলাকার ওই ফ্ল্যাটে থাকতেন। অধিদপ্তরের পরিদর্শক মোহাম্মদ খোরশেদ আলম বাদী হয়ে ভাটারা থানায় মামলা করেছেন। এজাহারে বলা হয়েছে, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে অভিযান চালানো হয় এবং ফ্ল্যাট তল্লাশি করে সাদা পলিথিনে মোড়ানো গাঁজা উদ্ধার করা হয়।
জিজ্ঞাসাবাদে সাইম কর্মকর্তাদের জানিয়েছেন, তিনি একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েন। প্রায় দুই মাস আগে অনলাইনে মাদক বিক্রির জন্য তিনি নিজেই একটি ওয়েবসাইট তৈরি করেন। ওয়েবসাইটে আসা আগ্রহীদের নিয়ে তিনি টেলিগ্রামে গোপন গ্রুপ খোলেন। কর্মকর্তাদের ভাষ্য, দুই মাস নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর গত দুই সপ্তাহ ধরে তিনি কুশ ও সিনথেটিক গাঁজা বিক্রি করছিলেন। এই তথ্য জিজ্ঞাসাবাদের বরাতে কর্মকর্তাদের দেওয়া, আদালতে এখনো প্রমাণিত হয়নি।
অধিদপ্তরের ঢাকা বিভাগীয় গোয়েন্দা কার্যালয়ের উপপরিচালক মো. মেহেদী হাসান প্রথম আলোকে বলেন, মাদক ব্যবসায়ীরা এখন প্রযুক্তি ব্যবহার করে নতুন নতুন কৌশলে মাদক বিক্রির চেষ্টা করছেন। তাঁর ভাষ্য, গোয়েন্দা দল সাইবার প্যাট্রোলিংয়ের মাধ্যমে এ ধরনের কার্যক্রম শনাক্ত করে এবং পরে অভিযান চালায়। এই অভিযানে উচ্চমাত্রার সিনথেটিক গাঁজা, কুশ সিড ও মাদক প্রক্রিয়াজাতকরণের বিভিন্ন সরঞ্জাম উদ্ধার হয়েছে। অধিদপ্তরের সূত্র আরও জানায়, শুধু মাঠপর্যায়ে নয়, অনলাইনেও মাদক ব্যবসায়ীদের ওপর নজর রাখা হচ্ছে। প্রযুক্তির আড়ালে থেকে ব্যবসা চালালেও তাঁদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার কার্যক্রম চলছে।
বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার একাধিক মাদক চক্র নিয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শিক্ষার্থী প্রথম আলোকে বলেন, ওই এলাকায় কয়েকটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়কে ঘিরে একাধিক চক্র সক্রিয়। মাদকের কয়েকটি নির্দিষ্ট স্থানও আছে। তবে ইদানীং অনলাইনে অর্ডার করলে বাসায় পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে বলে তিনি জানান।
এই ঘটনা মাদক ব্যবসার বদলে যাওয়া চেহারা তুলে ধরেছে। আগে ক্রেতাকে নির্দিষ্ট স্পটে যেতে হতো, এখন কিউআর কোড স্ক্যান করে একটি গোপন গ্রুপে ঢুকে অর্ডার দেওয়া যায়। এতে বিক্রেতার ঝুঁকি কমে, আর ক্রেতার জন্য প্রবেশ সহজ হয়। বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণ শিক্ষার্থীরা এমন চক্রের সহজ লক্ষ্যে পরিণত হতে পারেন। মাদকসেবী ও বিক্রেতা, দুই ভূমিকাতেই শিক্ষার্থীদের নাম আসায় বিষয়টি অভিভাবক ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের জন্য বাড়তি উদ্বেগের।
তবে অনেক প্রশ্নের উত্তর এখনো মেলেনি। গ্রেপ্তার তরুণ একাই চক্রটি চালাতেন, নাকি তাঁর পেছনে আরও বড় নেটওয়ার্ক আছে, তা স্পষ্ট নয়। কুশ ও সিনথেটিক গাঁজার উৎস কী, কীভাবে সেগুলো তাঁর হাতে পৌঁছাত এবং টেলিগ্রাম গ্রুপের ২৫০ সদস্যের মধ্যে কতজন প্রকৃত ক্রেতা, সে বিষয়েও তথ্য জানা যায়নি। যে দুই বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম বলা হয়েছে, সেগুলোর কর্তৃপক্ষের প্রতিক্রিয়াও পাওয়া যায়নি।
এখন নজর থাকবে এই মামলার তদন্তে চক্রের অন্য সদস্য ও সরবরাহকারীদের শনাক্ত করা যায় কি না, সেদিকে। একই সঙ্গে টেলিগ্রাম গ্রুপের সদস্যদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয় এবং অনলাইনে মাদক ব্যবসা ঠেকাতে অধিদপ্তর কত দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ নেয়, সেটিও দেখার বিষয়।

