ইসলামী ব্যাংকের চট্টগ্রামের জুবিলি রোড শাখা থেকে আরামিট সিমেন্ট পিএলসির নামে ঋণ নিয়ে ৬৩ কোটি ৭৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা আত্মসাতের অভিযোগে সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদ, তাঁর স্ত্রী রুকমিলা জামানসহ ১৫ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) দুদকের উপসহকারী পরিচালক মো. রুবেল হোসেন বাদী হয়ে চট্টগ্রাম-১ সমন্বিত জেলা কার্যালয়ে মামলাটি করেন। আসামিদের মধ্যে আরামিট সিমেন্টের কর্মকর্তা এবং ইসলামী ব্যাংকের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তারাও রয়েছেন।
মামলায় প্রতারণা, জালিয়াতি, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং অর্থপাচারের মাধ্যমে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ আনা হয়েছে। এ ঘটনায় দণ্ডবিধির সংশ্লিষ্ট ধারা, দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন ও মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইনের অধীনে অভিযোগ করা হয়েছে।
যেভাবে ঋণের অর্থ বিতরণের অভিযোগ
মামলার এজাহার অনুযায়ী, ২০১৬ সালের ২৪ জানুয়ারি ইসলামী ব্যাংকের বহদ্দারহাট শাখায় আরামিট সিমেন্টের নামে একটি চলতি হিসাব খোলা হয়। পরবর্তী সময়ে ২০১৭ সালের ১৫ মে হিসাবটি ব্যাংকের জুবিলি রোড শাখায় স্থানান্তর করা হয়।
ওই বছরের ১৫ অক্টোবর প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক রুকমিলা জামান ৫০০ কোটি টাকা কার্যকরী মূলধন ঋণের আবেদন করেন। ৮ নভেম্বর ব্যাংকের ক্রেডিট কমিটির ৫১তম সভায় ৩৫০ কোটি টাকা ঋণ দেওয়ার সুপারিশ করা হয়। পরে ব্যাংকের নির্বাহী কমিটি ঋণটি অনুমোদন করে।
দুদকের অভিযোগ, ঋণের অর্থ ছাড় করতে ভুয়া বাই-মুরাবাহা ডিল তৈরি করা হয়েছিল। এ প্রক্রিয়ায় আরামিট সিমেন্টের হিসাব বিভাগের সহকারী মহাব্যবস্থাপক মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলমকে ব্যবসায়ী ও সরবরাহকারী হিসেবে দেখানো হয়। তাঁর নামে ‘ক্লাসিক ট্রেডিং’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানকে সরবরাহকারী হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছিল।
এজাহারে বলা হয়েছে, ওই প্রতিষ্ঠানের নামে ট্রেড লাইসেন্স সংগ্রহ, ব্যাংক হিসাব খোলা এবং প্রয়োজনীয় কাগজপত্র তৈরির মাধ্যমে পণ্য সরবরাহের ভুয়া তথ্য ব্যাংকে জমা দেওয়া হয়। প্রকৃতপক্ষে পণ্য সরবরাহ না করেই এসব নথির ভিত্তিতে ঋণের অর্থ বিতরণ করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছে দুদক।
দুদকের তথ্য অনুযায়ী, আরামিট সিমেন্টের নামে মোট ৫৪টি বাই-মুরাবাহা ডিলের মাধ্যমে ২০৫ কোটি ৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা বিতরণ করা হয়। এর মধ্যে ২৭টি ডিলের মাধ্যমে ৬৩ কোটি ৭৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা উত্তোলন ও স্থানান্তর করা হয়েছে বলে মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে।
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, ঋণের অর্থ আরামিট গ্রুপের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কর্মচারীদের নামে থাকা ব্যাংক হিসাবে স্থানান্তর ও রূপান্তরের মাধ্যমে আত্মসাৎ করা হয়।
মামলার অন্য আসামিরা
জাবেদ ও তাঁর স্ত্রী রুকমিলা জামান ছাড়াও মামলার আসামিদের মধ্যে রয়েছেন আরামিট সিমেন্টের প্রধান অর্থ কর্মকর্তা ও ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংকের সাবেক পরিচালক মোহাম্মদ শাহ আলম, প্রতিষ্ঠানটির সহকারী মহাব্যবস্থাপক একেএম মারুফ এবং ক্লাসিক ট্রেডিংয়ের স্বত্বাধিকারী মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম।
ইসলামী ব্যাংকের যেসব কর্মকর্তা আসামি হয়েছেন, তাঁদের মধ্যে রয়েছেন মো. মহিউদ্দীন, মোহাম্মদ আখতার হোসেন, মোহাম্মদ আব্দুল হক, মো. আবদুল কাদের, মুহাম্মদ আবদুল করিম, মো. শহিদুল্লাহ, মুহাম্মদ নিজাম উদ্দীন, আবুল কালাম আজাদ, মোহাম্মদ মহসীন আলী ও রিদওয়ানুল হক।
জাবেদের সম্পদ নিয়ে আগেও তদন্ত ও মামলা
সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদ এবং তাঁর স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, অবৈধ সম্পদ অর্জন ও অর্থপাচারের অভিযোগে আগে থেকেই অনুসন্ধান চালাচ্ছে দুদকের একটি যৌথ দল। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তাঁর বিরুদ্ধে অনুসন্ধান শুরু হয়। এ পর্যন্ত বিভিন্ন অভিযোগে তাঁর বিরুদ্ধে একাধিক মামলা করেছে সংস্থাটি।
২০২৫ সালের মার্চে তাঁর ৩৯টি ব্যাংক হিসাব অবরুদ্ধ এবং ২৩টি কোম্পানির শেয়ার জব্দের আদেশ দেওয়া হয়। পরবর্তী সময়ে অনুসন্ধানের বিভিন্ন পর্যায়ে তাঁর ও স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আরও ব্যাংক হিসাব এবং বিও হিসাব অবরুদ্ধ করা হয়।
চলতি বছরের ১৩ জানুয়ারি দুদকের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে যুক্তরাষ্ট্র, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ফিলিপাইন, মালয়েশিয়া, কম্বোডিয়া, ভারত, থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনামে থাকা তাঁর ৩৩০টি বাড়ি, ফ্ল্যাট ও অ্যাপার্টমেন্ট জব্দের আদেশ দেন আদালত। দুদকের হিসাবে, এসব সম্পদ এবং যুক্তরাষ্ট্রের দুটি কোম্পানিতে তাঁর বিনিয়োগের মূল্য প্রায় ২ হাজার ৩২১ কোটি টাকা।
এ ছাড়া ২৬ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাজ্যে তাঁর নামে থাকা ৫১৮টি ফ্ল্যাট ও অ্যাপার্টমেন্ট জব্দের আদেশ দেওয়া হয়। দুদকের আবেদনে এসব সম্পদের মূল্য দেখানো হয়েছে ২৭ কোটি ১৮ লাখ ৫২ হাজার ৮৭২ পাউন্ড।
ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক থেকে ঋণের নামে ২৫ কোটি টাকা বিদেশে পাচারের অভিযোগে করা আরেক মামলায় চলতি বছরের মার্চে জাবেদ, তাঁর স্ত্রীসহ ৩৬ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেন চট্টগ্রামের একটি আদালত। একই সঙ্গে পলাতক আসামিদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানাও জারি করা হয়।
ইসলামী ব্যাংকের ঋণসংক্রান্ত নতুন মামলাটিতে আনা অভিযোগের বিষয়ে তদন্তের ফল এখনো প্রকাশিত হয়নি। অভিযোগ প্রমাণিত হওয়া এবং আদালতে বিচারিক সিদ্ধান্তের আগে আসামিদের দায় চূড়ান্তভাবে নির্ধারিত নয়।

