ফেনীর হৃদয়বিদারক হত্যাকাণ্ডে পুলিশ তিনজনকে গ্রেপ্তার করেছে। এই ঘটনায় প্রধান অভিযুক্ত আশ্রাফ হোসেন চৌধুরী ওরফে তুষার (২০) আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। শুক্রবার সন্ধ্যায় ফেনী আদালতে তিনি এ জবানবন্দি দেন।
আশ্রাফ নিহত চতুর্থ শ্রেণির ছাত্র আহনাফের বড় ভাইয়ের বন্ধু। আহনাফ নিখোঁজ হওয়ার পরদিন থেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার সন্ধান চেয়ে একাধিক পোস্ট শেয়ার করেন আশ্রাফ। এমনকি পরিবারের সঙ্গে দেখা করে এবং মুঠোফোনে তাদের নানা পরামর্শ দেন।
গত বৃহস্পতিবার দুপুরে ফেনী সদর উপজেলার দেওয়ানগঞ্জ রেললাইনের পাশের ডোবা থেকে আহনাফের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। এর আগে ৮ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় আহনাফ নিখোঁজ হয়।
পুলিশ জানিয়েছে, ৮ ডিসেম্বর সন্ধ্যা সাড়ে সাতটায় কোচিং থেকে বের হয়ে স্থানীয় বায়তুল খায়ের জামে মসজিদে নামাজ পড়তে গিয়েছিল আহনাফ। নামাজ শেষে বাসায় ফেরার পথে তাকে অপহরণ করা হয়। অপহরণকারীরা তাকে দেওয়ানগঞ্জ এলাকায় নিয়ে গিয়ে চেতনানাশক দিয়ে অচেতন করে। এরপর তার ছবি তুলে হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে তার বাবার কাছে ১২ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করে।
মুক্তিপণ দিতে বিলম্ব হওয়ায় এবং আহনাফকে ছেড়ে দিলে ধরা পড়ার আশঙ্কায় অপহরণকারীরা তাকে শ্বাসরোধে হত্যা করে। হত্যার পর লাশ গুম করতে রেললাইনের পাথর দিয়ে তার স্কুলব্যাগ ভর্তি করে ডোবায় ফেলে দেওয়া হয়।
এই ঘটনায় আশ্রাফ চৌধুরীসহ তিনজনের নাম উঠে আসে। পুলিশের দাবি, ৮ আগস্ট রাত দুইটা থেকে তিনটার মধ্যে আহনাফকে হত্যা করা হয়। অথচ পরদিন থেকেই আশ্রাফ ফেসবুকে আহনাফের সন্ধান চেয়ে পোস্ট শেয়ার করছিলেন।
আশ্রাফের এসব পোস্টে তিনি আহনাফের পরিবারের প্রতি সহানুভূতির ভাষা ব্যবহার করেন। একটি পোস্টে তিনি লেখেন, ‘আল্লাহ আপনার রহমতের উসিলায় আমাদের ছোট ভাইটাকে আমাদের মাঝে ফিরিয়ে দিন।’ অন্য একটি পোস্টে আহ্বান জানান, ‘আপনারা কেউ যদি আমার ছোট ভাইটার সন্ধান পেয়ে থাকেন, তাহলে অতি দ্রুত যোগাযোগ করুন।’
এদিকে, আশ্রাফের সন্দেহজনক আচরণ ও পরিবারের সঙ্গে অতি উৎসাহী যোগাযোগ পুলিশের নজরে আসে। পুলিশ তাকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করলে তিনি হত্যাকাণ্ডে নিজের সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করেন। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে অপর দুই অভিযুক্ত মোবারক হোসেন ওয়াসিম (২০) ও ওমর ফারুক রিফাত (২০)-কে গ্রেপ্তার করা হয়।
গ্রেপ্তারকৃত আশ্রাফ ফেনী পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের প্রথম বর্ষের ছাত্র। তিনি ছাত্রদলের একজন কর্মী। জেলা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক মোরশেদ আলম জানিয়েছেন, আশ্রাফের কোনো দলীয় পদ-পদবি নেই। তবে তার কর্মকাণ্ডে সংগঠনের সঙ্গে কোনো সংযোগের দায় অস্বীকার করেছেন তিনি।
পুলিশ জানায়, হত্যার আগে অপহরণকারীরা একটি লুট করা মোবাইল ফোন ব্যবহার করে আহনাফের বাবার কাছে মুক্তিপণের জন্য হোয়াটসঅ্যাপ মেসেজ পাঠায়। জেলা পুলিশ সুপার মো. হাবিবুর রহমান জানান, ৫ আগস্ট এক নারীর মোবাইল লুট হওয়া এ মামলার মূল সূত্র হিসেবে কাজ করেছে।
ফেনী মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মর্ম সিংহ ত্রিপুরা জানিয়েছেন, তিন আসামি পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে অপরাধ স্বীকার করেছেন। পরে আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতেও তারা হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে স্বীকারোক্তি দেন।
নিহত আহনাফের বাবা মাঈন উদ্দিন বলেন, ‘আশ্রাফ আমাদের নিখোঁজ ছেলেকে খুঁজে বের করার পরামর্শ দিতেন। এমনকি মুক্তিপণ দিয়ে ছেলেকে উদ্ধার করার জন্যও অনুরোধ করেছিলেন। বিশ্বাসই করতে পারছি না যে, তিনিই এমন নির্মম কাজে জড়িত।’
পুলিশ সুপার হাবিবুর রহমান বলেন, ‘আমরা অপরাধীদের দ্রুত আইনের আওতায় এনেছি। প্রযুক্তির সাহায্যে মামলার অগ্রগতি সম্ভব হয়েছে। বিচার প্রক্রিয়ায় আমরা সর্বোচ্চ সহায়তা নিশ্চিত করব।’
এই নির্মম ঘটনায় ফেনীর মানুষ শোকাহত। শিশুটির পরিবার এখন ন্যায়বিচারের প্রত্যাশায় দিন গুনছে।

