বাংলাদেশ ফিন্যানশিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) জানিয়েছে, বিগত সরকারের শেষ বছরে সন্দেহজনক লেনদেনের সংখ্যা পৌঁছেছে ১৭০৪৯-এ, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ২১ শতাংশ বেশি। ব্যাংক খাতের এমন অবস্থার পেছনে রয়েছে দুর্নীতি, ঋণ জালিয়াতি এবং বিপুল অর্থপাচারের প্রভাব। আর্থিক বিশ্লেষকদের মতে, প্রকৃত সন্দেহজনক লেনদেনের সংখ্যা এ চিত্রের চেয়েও অনেক বেশি হতে পারে।
ব্যাংক কর্মকর্তারা প্রতিদিনই বিভিন্ন ধরনের লেনদেনকে সন্দেহজনক হিসেবে চিহ্নিত করছেন। ছোট গ্রাহকের হিসাবে বড় অঙ্কের লেনদেন, অপরিচিত একাউন্টে টাকা স্থানান্তর, ছোট ব্যবসায়ীর নামে বড় ঋণ ইত্যাদি ঘটনাগুলো সন্দেহজনক বলে বিবেচিত হয়। এ ধরনের লেনদেনের রিপোর্ট বিএফআইইউতে পাঠানো হয়।
বিএফআইইউয়ের একজন কর্মকর্তা জানান, এখন পরিচয় গোপন রেখে সন্দেহজনক লেনদেনের অভিযোগ জানানো সম্ভব হওয়ায় অভিযোগের সংখ্যা বেড়েছে। তবে বিএফআইইউ শুধু অভিযোগ গ্রহণ করেই থেমে থাকে না; অভিযোগ তদন্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের উদ্যোগ নেয়।
অর্থপাচারের বিস্তৃতি-
বাংলাদেশ থেকে প্রতি বছর বিপুল অর্থ পাচার হচ্ছে। পাচারের উদ্দেশ্যগুলো নানা রকম-অপরাধমূলক লেনদেন আড়াল, কর ফাঁকি, বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার আইন ভাঙা এবং বিদেশে নাগরিকত্ব বা উন্নত জীবনযাত্রার লোভ। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রণীত শ্বেতপত্র অনুসারে, আওয়ামী লীগ সরকারের ১৫ বছরে প্রায় ২৪০ বিলিয়ন ডলার পাচার হয়েছে।
সরকারের দায়িত্ব নেওয়ার পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকার তিন শতাধিক সাবেক মন্ত্রী, এমপি এবং উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের ব্যাংক হিসাব জব্দ করেছে। ৫ আগস্ট থেকে অক্টোবর পর্যন্ত সময়ে বিএফআইইউ, এনবিআর এবং দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) যৌথভাবে ৩৪৩ জন প্রভাবশালী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের অ্যাকাউন্ট জব্দ করেছে। এতে মজুদ ছিল প্রায় ১৪ হাজার ৫০০ কোটি টাকা।
আন্তর্জাতিক সহযোগিতার প্রয়াস-
বিএফআইইউ আন্তর্জাতিক গোয়েন্দা সংস্থা এডগমন্টসহ ১৭৭টি দেশের সঙ্গে যুক্ত। অর্থপাচার রোধে তাদের সঙ্গে তথ্য আদান-প্রদান ও সম্ভাব্য গন্তব্যস্থলগুলোতে চিঠি পাঠানো হয়েছে। সরকার পাচার হওয়া অর্থ ফেরানোর জন্য সব ধরনের প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
অভিযুক্তদের বিচার ও শাস্তি-
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, সন্দেহজনক লেনদেন শনাক্তে তথ্যপ্রযুক্তির উন্নয়ন ভূমিকা রাখলেও ১৭ হাজার লেনদেন প্রকৃত সংখ্যা নয়। তিনি মনে করেন, আর্থিক অনিয়মের প্রকৃত চিত্র আরো ভয়াবহ। দুর্নীতির সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা না নিলে আর্থিক সুশাসন ও মুক্তি সম্ভব নয়।
যৌথ টিমের উদ্যোগ-
গত ১৪ ডিসেম্বর, পাচার হওয়া অর্থ ফেরানোর লক্ষ্যে দুদক, সিআইডি এবং এনবিআরের সমন্বয়ে একটি টিম গঠন করা হয়েছে। এ টিম আইনি সহায়তা পাবে অ্যাটর্নি জেনারেলের অফিস থেকে এবং বিএফআইইউ বা বাংলাদেশ ব্যাংকে এর কার্যালয় স্থাপন করা হবে। এই দলটির নেতৃত্ব দেবে দুর্নীতি দমন কমিশন।
সন্দেহজনক লেনদেন ও অর্থপাচারের মতো ঘটনা দেশের আর্থিক কাঠামোকে অস্থিতিশীল করে তুলছে। এ বিষয়ে ত্বরিত ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদার করার প্রয়োজনীয়তা আজ আরো তীব্র হয়ে উঠেছে।

