মোবাইলে আর্থিক সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান ‘নগদ লিমিটেড’-এ আর্থিক জালিয়াতির অভিযোগ উঠেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শনে দেখা গেছে, ভুয়া পরিবেশক ও এজেন্ট দেখিয়ে বিপুল অঙ্কের ই-মানি তৈরি এবং অনিয়মিত লেনদেনের কারণে হিসাব মিলছে না ২ হাজার ৩৫৬ কোটি টাকা।
নগদের এই অনিয়মের ঘটনা সামনে আসে অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব নেওয়ার পর, যখন বাংলাদেশ ব্যাংক প্রতিষ্ঠানটিতে প্রশাসক ও ব্যবস্থাপনা কমিটি বসায়। পরিদর্শনে উঠে আসে অনুমোদনহীনভাবে তৈরি করা ৪১টি পরিবেশক হিসাব এবং অতিরিক্ত ই-মানি ইস্যুর বিষয়টি। এ জালিয়াতির দায়ে নগদের শীর্ষ পর্যায়ের ছয় কর্মকর্তার একটি তালিকা তৈরি করে ডাক অধিদপ্তরের কাছে পাঠানো হয়েছে, যাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছে প্রশাসক দল।
২০১৭ সালে ডাক অধিদপ্তর ও থার্ড ওয়েভ টেকনোলজির মধ্যে চুক্তি অনুযায়ী, একটি ব্যাংকে জমা থাকা টাকার সমপরিমাণ ই-মানি ইস্যু করার শর্ত ছিল। কিন্তু পরিদর্শনে দেখা যায়, নগদে ৬৪৫ কোটি টাকা অতিরিক্ত ই-মানি ইস্যু করা হয়েছে। একই সঙ্গে ১ হাজার ৭১১ কোটি টাকা বের করে নেওয়া হয় অনুমোদনহীন ৪১টি পরিবেশক হিসাবের মাধ্যমে। এসব হিসাব মূলত সরকারি ভাতা বিতরণের দায়িত্বে ছিল।
বিশেষত ভাতাভোগীদের হিসাবে টাকা পাঠানোর পর যারা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে টাকা উত্তোলন করেননি, তাদের অর্থ তুলে নেওয়া হয়েছে। এমনকি কুমিল্লার পরিবেশকের মাধ্যমে রংপুরের ভাতাভোগীদের অর্থ বিতরণের মতো অস্বাভাবিক ঘটনা সামনে এসেছে। নগদের একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, এসব জালিয়াতির মাধ্যমে বিপুল অর্থ হাতিয়ে নেওয়া হয়।
প্রতিষ্ঠানটিতে ঘটে যাওয়া অনিয়মের সময় নগদের মালিকানায় আওয়ামী লীগের একাধিক সংসদ সদস্য ও প্রভাবশালী ব্যক্তি যুক্ত ছিলেন। কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও ডাক অধিদপ্তর সবকিছু জানলেও কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। প্রশাসক দলের একজন সদস্য বলেছেন, এটি দেশের সবচেয়ে বড় ‘ডিজিটাল জালিয়াতি’। এই পরিস্থিতি সামাল দিতে নগদে ফরেনসিক নিরীক্ষা করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। যা জালিয়াতির প্রকৃত কারণ এবং সুবিধাভোগীদের চিহ্নিত করবে।
জালিয়াতির অভিযোগে ইতোমধ্যে নগদের পাঁচ শীর্ষ কর্মকর্তা বরখাস্ত হয়েছেন। ছয় কর্মকর্তার বিরুদ্ধে তদন্ত প্রতিবেদনও ডাক অধিদপ্তরে পাঠানো হয়েছে। এ তালিকায় রয়েছেন:
– নির্বাহী পরিচালক সাফায়েত আলম
– অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ আমিনুল হক
– উপব্যবস্থাপনা পরিচালক গোলাম মর্তুজা চৌধুরী
– প্রধান প্রযুক্তি কর্মকর্তা আবু রায়হান
– আর্থিক প্রশাসন প্রধান রাকিবুল ইসলাম
– সলিউশন ডিজাইন বিভাগের ফার্স্ট ভাইস প্রেসিডেন্ট নাজমুস সাকিব আকিব।
এ বিষয়ে নগদের প্রশাসক মুহম্মদ বদিউজ্জামান দিদার ডাক অধিদপ্তরকে লিখিত চিঠিতে জানিয়েছেন, চুক্তির শর্ত লঙ্ঘন ও ক্ষতিপূরণের জন্য ডাক অধিদপ্তর আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে পারে। তবে প্রশাসকের নিজস্ব আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার কোনো এখতিয়ার নেই।
২০১৮ সালে ডাক অধিদপ্তরের আবেদনের ভিত্তিতে বাংলাদেশ ব্যাংক শর্ত পূরণ না করায় নগদকে অনুমোদন দেয়নি। কিন্তু ২০১৯ সালের ২৬ মার্চ তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আনুষ্ঠানিকভাবে নগদ সেবার উদ্বোধন করেন। সরকারি তদারকির অভাব এবং শর্তহীন লেনদেনের সুযোগে নগদ দ্রুত দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম মোবাইলে আর্থিক সেবা প্রতিষ্ঠান হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। বর্তমানে নগদের গ্রাহক সংখ্যা প্রায় ৯ কোটি এবং দৈনিক লেনদেন ১ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে।
নগদ পরিচালনায় সংশ্লিষ্ট বেশ কয়েকজন শেয়ারহোল্ডার ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের সংশ্লিষ্টতা দেখা গেছে। থার্ড ওয়েভ টেকনোলজি প্রতিষ্ঠার পর মালিকানা পরিবর্তনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগের দুই সংসদ সদস্য নাহিম রাজ্জাক ও রাজী মোহাম্মদ ফখরুল যুক্ত হন। পরে আরো কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি প্রতিষ্ঠানটির শেয়ারধারী হন।
অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের সাবেক চেয়ারম্যান আনিস এ খান বলেছেন, “নগদের পেছনে বড় হাত ছিল বলেই এটি এত বড় হয়েছে। এখন গরিব মানুষের অর্থ ফিরিয়ে আনতে সরকারকে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।”
নগদের এই অনিয়মের ঘটনা একটি প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতার প্রতিফলন, যা মোবাইলে আর্থিক সেবা খাতে তদারকির অভাবকে সামনে এনেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের জালিয়াতি রোধে সরকারের উচিত কঠোর নিয়ন্ত্রণ ও নজরদারি ব্যবস্থা নিশ্চিত করা।
নগদের অনিয়মের এই তদন্ত ও ফরেনসিক নিরীক্ষার ফলাফলের দিকে এখন দেশের মানুষ তাকিয়ে রয়েছে।

