অনিবাসী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানে সেবা আমদানির বিপরীতে রেমিট্যান্স প্রেরণের ক্ষেত্রে নির্ধারিত হারে কর ও ভ্যাট কর্তনের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। এই বিধানের আওতায় সেবা খাতে রেমিট্যান্স প্রেরণের সময় ১৫ থেকে ৩০ শতাংশ কর এবং ১৫ শতাংশ ভ্যাট কর্তনের কথা বলা হয়েছে। তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক পর্যালোচনায় বেশ কয়েকটি ব্যাংকের এই নিয়ম লঙ্ঘনের তথ্য উঠে এসেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের অডিট রিপোর্ট অনুযায়ী, ২১টি ব্যাংকের মধ্যে ১২টি ব্যাংকের সেবা খাতে কর ও ভ্যাট কর্তনের ক্ষেত্রে অনিয়ম ধরা পড়েছে।এসব ব্যাংক প্রাসঙ্গিক কর, ভ্যাট এবং বিলম্ব ফি কর্তন করেনি। এই অনিয়মের ফলে প্রায় ৩১৫ কোটি ১৭ লাখ টাকা ক্ষতি হয়েছে। অন্যদিকে ৯টি ব্যাংক এখনও অডিট রিপোর্ট জমা দেয়নি। এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক একাধিকবার তাগিদপত্র দিলেও তারা সাড়া দেয়নি।
ব্যাংকগুলোর অনিয়মের ধরন-
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে বেশ কিছু ব্যাংক সেবা খাতে রেমিট্যান্স পাঠানোর সময় আয়কর আইন, ২০২৩ এবং মূল্য সংযোজন কর ও সম্পূরক শুল্ক আইন, ২০১২ অনুযায়ী কর ও ভ্যাট কর্তনে ব্যর্থ হয়েছে। সাধারণত, ইনভয়েস ভ্যালুর ভিত্তিতে ট্যাক্স বেইজ নির্ধারণ করে কর ও ভ্যাট কর্তনের কথা। কিন্তু এই প্রক্রিয়ায় উল্লেখযোগ্য অনিয়ম চিহ্নিত হয়েছে।
প্রধান অনিয়মগুলো হলো:-
- সেবা খাতে রেমিট্যান্স প্রেরণের সময় কর ও ভ্যাট কর্তন না করা।
- নির্ধারিত হারের চেয়ে কম হারে কর ও ভ্যাট কর্তন।
- চালানের ক্ষেত্রে সঠিক প্রক্রিয়া অনুসরণ না করা এবং অনিবাসীর পরিবর্তে নিবাসীর নামে চালান জমা প্রদান।
কর ও ভ্যাট আদায়: ব্যাংকগুলোর নাম ও পরিমাণ-
বাংলাদেশ ব্যাংক ২৬টি ব্যাংক থেকে ১০২ কোটি টাকারও বেশি কর, ভ্যাট এবং বিলম্ব ফি আদায় করেছে। তবে ১২টি ব্যাংকের ক্ষেত্রে প্রায় ৩১৫ কোটি টাকার অনাদায়ী কর ও ভ্যাট চিহ্নিত হয়েছে। কিছু প্রধান ব্যাংকের অনিয়মের বিস্তারিত নিম্নরূপ:
- এবি ব্যাংক: ২.৮৫ কোটি টাকা।
- ডাচ-বাংলা ব্যাংক: ২.১৭ কোটি টাকা।
- ইস্টার্ন ব্যাংক: ২.৭৫ কোটি টাকা।
- সিটি ব্যাংক: ২১.৩৭ কোটি টাকা।
- ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক: ১১৬.৫২ কোটি টাকা।
অন্যদিকে, ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক, এইচএসবিসি এবং সিটি ব্যাংকের মতো ব্যাংকগুলো থেকে বাংলাদেশ ব্যাংক সবচেয়ে বেশি কর, ভ্যাট এবং বিলম্ব ফি আদায় করেছে।
অডিট রিপোর্ট জমা না দেওয়া ব্যাংক-
৯টি ব্যাংক এখনও তাদের অডিট রিপোর্ট জমা দেয়নি। এই ব্যাংকগুলো হলো: সোনালী ব্যাংক, ইসলামী ব্যাংক, পূর্বালী ব্যাংক, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক, ব্যাংক এশিয়া, এনআরবিসি ব্যাংক, ট্রাস্ট ব্যাংক, শাহজালাল ইসলামী ব্যাংক এবং আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক। বাংলাদেশ ব্যাংক এই ব্যাংকগুলোকে বারবার তাগিদ দিলেও তারা কোনো পদক্ষেপ নেয়নি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সুপারিশ-
বাংলাদেশ ব্যাংক জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) আওতাধীন কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সেলে (সিআইসি) এই অনিয়মের বিস্তারিত প্রতিবেদন পাঠিয়েছে। কর, ভ্যাট এবং বিলম্ব ফি আদায়ে ব্যর্থ ব্যাংকগুলোর বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করা হয়েছে।
সেবা খাতে রেমিট্যান্স প্রেরণের সময় কর ও ভ্যাট কর্তন নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোর আরও দায়িত্বশীল হওয়া প্রয়োজন। এ ধরনের অনিয়ম রাজস্ব ব্যবস্থাকে দুর্বল করার পাশাপাশি আর্থিক শৃঙ্খলার ক্ষেত্রে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। বাংলাদেশ ব্যাংক ও এনবিআরের যৌথ উদ্যোগে এই সমস্যার সমাধান এবং দোষী ব্যাংকগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি।

