রাজধানীর বিমানবন্দর সড়কে সৌন্দর্যবর্ধনের নামে বিশাল অংকের অর্থ অপচয়ের অভিযোগ উঠেছে। পাঁচ বছর ধরে বিভিন্ন প্রকল্পে অন্তত ৫৯ কোটি টাকা ব্যয় হলেও এসব প্রকল্পের কার্যকারিতা প্রশ্নবিদ্ধ। সড়কের বিভিন্ন স্থানে বসানো হয়েছে অত্যাধুনিক এলইডি বাতি, বিশালাকার টেলিভিশন, ও বিভিন্ন প্রজাতির গাছ। কিন্তু এসবের বেশির ভাগই অকেজো হয়ে পড়ে আছে। আর পুরো প্রকল্প পরিচালনার পেছনে জড়িয়ে আছে ক্ষমতার প্রভাব, অস্বচ্ছ প্রক্রিয়া এবং সম্ভাব্য দুর্নীতি।
সড়কের পাশের বিশাল টেলিভিশনটি বসানো এবং তার স্থাপন থেকে রক্ষণাবেক্ষণে খরচ হয়েছে প্রায় ৬ কোটি টাকা। তবে এই টেলিভিশন কোনোদিন চালু হয়নি। এর ওপর জমেছে ধুলোর স্তর। স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, টেলিভিশনের মূল উদ্দেশ্য কী, তা পরিষ্কার নয়। শুধু তাই নয়, ৬৪৭টি এলইডি বাতি লাগাতে এবং রক্ষণাবেক্ষণে খরচ দেখানো হয়েছে ১৩ কোটি টাকা। প্রকৌশলীরা এই ব্যয়কে “মাত্রাতিরিক্ত” বলে অভিহিত করেছেন।
সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর (সওজ) একক দরপত্র ছাড়াই এসব প্রকল্পের কাজ দেয় আবেদ মনসুর কনস্ট্রাকশন লিমিটেডকে। প্রতিষ্ঠানটির মালিক আবেদ মনসুর সাবেক সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের ঘনিষ্ঠ ছিলেন। ক্ষমতার এই ঘনিষ্ঠতার সুবাদে তিনি ২০২০ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে একাধিক প্রকল্পের কাজ পেয়েছেন। যার আর্থিক পরিমাণ প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে সৌন্দর্যবর্ধনের এই প্রকল্পগুলো অন্যতম।
সওজের তথ্য অনুযায়ী, সৌন্দর্যবর্ধনের নামে বিভিন্ন জায়গায় গাছ লাগানো হয়েছে, যেগুলোর বেশির ভাগই এখন ঝোপঝাড়ে রূপ নিয়েছে। ১৫ কোটি টাকার বেশি ব্যয়ে নির্মিত যাত্রীছাউনিগুলোও কার্যত অকার্যকর। বাসগুলো নির্ধারিত যাত্রীছাউনি ব্যবহার না করে অন্য জায়গায় থামছে।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক মো. হাদীউজ্জামান এ বিষয়ে বলেন, “এসব সৌন্দর্যবর্ধনের প্রকল্প পরিকল্পনাহীন এবং উদ্দেশ্যবিহীন। এগুলো শুধুমাত্র ঠিকাদারকে কাজ দেওয়ার জন্য করা হয়, যার মাধ্যমে কিছু ব্যক্তি আর্থিক সুবিধা লাভ করেন।”
সৌন্দর্যবর্ধনের নামে প্রকল্পগুলোর ব্যয়ের অস্বাভাবিকতা ও কার্যকারিতার অভাব প্রশাসনিক ব্যর্থতার প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মধ্যে কেউ এই অপচয়ের দায় স্বীকার করতে প্রস্তুত নয়। সাবেক মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের আত্মগোপন এবং দেশ ত্যাগ করায় তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি। অন্যদিকে সওজের বর্তমান কর্মকর্তারা বলছেন, এই প্রকল্প তাঁদের পূর্বসূরিদের সময় বাস্তবায়িত হয়েছে।
এটাই প্রথম নয়। এর আগে ২০১৪ ও ২০১১ সালের ক্রিকেট বিশ্বকাপ উপলক্ষে বিমানবন্দর সড়কে সৌন্দর্যবর্ধনের নামে যথাক্রমে ১১৫ কোটি ও ৫৭ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছিল। সেগুলোর অনেক কাজই পরে অকার্যকর প্রমাণিত হয়।
সৌন্দর্যবর্ধনের নামে এ ধরনের অপচয় বন্ধ করতে কঠোর নজরদারি ও জবাবদিহিতার দাবি জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। প্রকল্পের প্রতিটি ধাপে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং অপ্রয়োজনীয় খরচের জন্য দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া এখন সময়ের দাবি।

