বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বিদ্যুৎ সরবরাহকারী ভারতীয় প্রতিষ্ঠান আদানি পাওয়ারের বিরুদ্ধে চুক্তি লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলেছে। রয়টার্সের হাতে পাওয়া নথি থেকে জানা গেছে, আদানি ভারতের একটি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে কর সুবিধা পেলেও তা চুক্তি অনুযায়ী বাংলাদেশকে জানায়নি কিংবা ভাগাভাগি করেনি। বরং কর সুবিধার তথ্য গোপন রাখা হয়।
২০১৭ সালে ভারতের ধনকুবের গৌতম আদানির নিয়ন্ত্রণাধীন আদানি পাওয়ার বাংলাদেশের সঙ্গে একটি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ সরবরাহের চুক্তি করে। চুক্তিটি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকার টেন্ডার ছাড়াই অনুমোদন করেছিল এবং এটি বাংলাদেশের অন্যান্য কয়লাভিত্তিক প্রকল্পগুলোর তুলনায় ব্যয়বহুল ছিল। এর ফলে, বাংলাদেশের পক্ষ থেকে এখন এই চুক্তি পুনর্মূল্যায়নের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
রয়টার্সের প্রাপ্ত নথি অনুযায়ী, ২০১৭ সালের চুক্তিতে বলা হয়েছিল, কর সুবিধার ক্ষেত্রে আদানি পাওয়ার বাংলাদেশের সঙ্গে ভাগাভাগি করবে। কিন্তু ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে এবং অক্টোবরে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি) আদানিকে কর সুবিধা ভাগাভাগি করার অনুরোধ জানালেও কোনো সাড়া পায়নি। কর সুবিধার প্রভাব নিয়ে বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এই সুবিধা হস্তান্তর করা হলে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ ক্রয়ে প্রায় ২৮.৬ মিলিয়ন ডলার সাশ্রয় হতো।
বিদ্যুৎ উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান বলেন, ভবিষ্যতে আলোচনার সময় এই কর সাশ্রয়ের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রে আদানি গ্রুপের বিরুদ্ধে ২৬৫ মিলিয়ন ডলারের ঘুষ কেলেঙ্কারির অভিযোগে মামলা দায়ের করা হয়। অন্তর্বর্তী সরকার আশা করছে, এই অভিযোগ কাজে লাগিয়ে আদানি পাওয়ারের সঙ্গে বিদ্যুৎ চুক্তি পুনর্মূল্যায়নের চাপ দেওয়া যাবে।
বাংলাদেশ ইতোমধ্যে ২৫ বছরের মেয়াদি এই চুক্তি পর্যালোচনা করতে একটি বিশেষজ্ঞ প্যানেল গঠন করেছে। শেখ হাসিনার সরকারের সময় স্বাক্ষরিত প্রধান প্রধান জ্বালানি চুক্তিগুলোও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব নেন নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনুস। ইউনুসের সরকার বিদ্যুৎ চুক্তির বৈধতা ও কার্যকারিতা যাচাইয়ের উদ্যোগ নেয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, টেন্ডার ছাড়া এমন চুক্তি স্বাভাবিক নয়। অস্ট্রেলিয়ার থিঙ্কট্যাঙ্ক ক্লাইমেট এনার্জি ফাইন্যান্সের পরিচালক টিম বাকলে বলেন, টেন্ডারের মাধ্যমে সেরা মূল্য নিশ্চিত করা যায়।
শ্বেতপত্র তৈরির দায়িত্বে থাকা একটি কমিটি জানায়, আদানি গ্রুপের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগের কারণে বাংলাদেশেরও এই চুক্তি খতিয়ে দেখা উচিত। কমিটি আরও উল্লেখ করে, চুক্তিটি ‘তড়িঘড়ি করে’ করা হয়েছে।
২০২৩ সালের জুলাই থেকে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হলেও আদানি পাওয়ারের বিল পুরোপুরি পরিশোধ করেনি বাংলাদেশ। আদানির দাবি, তাদের ৯০০ মিলিয়ন ডলার পাওনা রয়েছে, তবে বিপিডিবি এই অঙ্ক ৬৫০ মিলিয়ন ডলার বলে উল্লেখ করেছে।
অক্টোবরে বাংলাদেশ ৯৭ মিলিয়ন ডলার পরিশোধ করলেও আদানি পাওয়ার ৩১ অক্টোবর থেকে বিদ্যুৎ সরবরাহ অর্ধেকে কমিয়ে দেয়। বাংলাদেশে ডলার সংকটের কারণে এই পাওনা নিয়ে সমস্যা আরও ঘনীভূত হয়েছে।
চুক্তি অনুযায়ী, বিদ্যুতের দাম নির্ধারণের সূচকের পরিবর্তন নিয়েও মতবিরোধ রয়েছে। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে দামের পরিবর্তন আনতে চাপ দেওয়া হলেও আদানি তা মানেনি। এ কারণে উভয় পক্ষ শিগগিরই আলোচনায় বসতে যাচ্ছে।
বাংলাদেশের আদালত আদানি পাওয়ারের সঙ্গে করা চুক্তি তদন্তের নির্দেশ দিয়েছে। বিদ্যুৎ উপদেষ্টা ফাওজুল কবির খান বলেন- যদি তদন্তে প্রমাণ হয় যে চুক্তিতে দুর্নীতি হয়েছে, তবে আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
চুক্তি সংক্রান্ত যেকোনো সালিশি কার্যক্রম সিঙ্গাপুরে হওয়ার কথা রয়েছে। তবে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে চুক্তি পুনর্মূল্যায়নের চেষ্টা অব্যাহত থাকবে।
আদানি গ্রুপ কর সুবিধা ও অন্যান্য অভিযোগ নিয়ে সরাসরি কোনো মন্তব্য করেনি। তারা বলেছে, চুক্তি অনুযায়ী সব দায়িত্ব পালন করা হয়েছে। তবে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে চুক্তি পুনর্মূল্যায়নের কোনো ইঙ্গিত তারা পায়নি।
যুক্তরাষ্ট্রে আনা অভিযোগগুলোকে ‘ভিত্তিহীন’ বলে উল্লেখ করেছে আদানি। একইসঙ্গে তারা দাবি করেছে, তাদের বিদ্যুৎ প্রকল্প ভারতের পররাষ্ট্রনীতির লক্ষ্য পূরণে সহায়ক হয়েছে।
আদানি পাওয়ারের সঙ্গে বাংলাদেশের চুক্তি নিয়ে বিতর্ক এখন নীতিগত ও অর্থনৈতিক পর্যায়ে। চুক্তি পুনর্মূল্যায়নের উদ্যোগ এবং পাওনা পরিশোধ নিয়ে মতবিরোধ দুই পক্ষের মধ্যে সম্পর্ক জটিল করে তুলেছে। তদন্ত ও আলোচনার মাধ্যমে এই সংকট সমাধানের পথ খুঁজতে হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

