ন্যাশনাল ব্যাংক থেকে শত শত কোটি টাকা ঋণ নেওয়া যেন এক ফাঁকা কলম চালানোর মতো সহজ ছিল মানহা প্রিকাস্ট টেকনোলজি লিমিটেডের জন্য। ২০১৭ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে, কার্যত কোনো কার্যক্রম ছাড়াই শুধুমাত্র কাগজে-কলমে প্রতিষ্ঠিত এই কোম্পানি একটানা ৬৪৭ কোটি টাকা ঋণ নিতে সক্ষম হয়। তবে এখানেই শেষ নয়।
পরে “মানহা প্রিকাস্ট” নিজেকে “ডেকিং স্মার্ট ব্যাটারি লিমিটেড” হিসেবে পুনঃব্র্যান্ডিং করে। নতুন পরিচয়ে কোম্পানিটি আরও ৫১৫ কোটি টাকা ঋণ সংগ্রহ করে। এই দুই পর্যায়ে কোম্পানিটির মোট ঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় ১১৬২ কোটি টাকা।
সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকের এক পরিদর্শন প্রতিবেদনে এই ঋণ জালিয়াতির বিস্তারিত প্রকাশ পেয়েছে। তদন্তে উঠে আসে, এই দুই প্রতিষ্ঠানের মূল সংস্থা মাইশা গ্রুপের হাত ধরেই এই আর্থিক অনিয়ম সংঘটিত হয়েছে। মাইশা গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন আওয়ামী লীগের প্রয়াত সংসদ সদস্য আসলামুল হক। এই গ্রুপের বিরুদ্ধে ইতোমধ্যেই ৪০০০ কোটি টাকার ঋণখেলাপির অভিযোগ রয়েছে।
তদন্তে দেখা যায়, ২৬ ডিসেম্বর ২০১৭ সালে প্রতিষ্ঠার দিনই মানহা প্রিকাস্ট দ্রুত গতিতে ট্রেড লাইসেন্স, টিআইএন এবং ব্যাংক অ্যাকাউন্ট পেয়ে ঋণের আবেদন করে। পরের দিনই ২৫০ কোটি টাকার ঋণ অনুমোদন পায়, যার মধ্যে ছিল ১৭০ কোটি টাকা টার্ম লোন এবং ৮০ কোটি টাকা কার্যকরী মূলধন।
২০১৯ সালের ২৪ ডিসেম্বর, মানহা প্রিকাস্ট নিজেকে “ডেকিং স্মার্ট ব্যাটারি টেকনোলজি” নামে পুনঃব্র্যান্ডিং করে। এতে ঋণের ধারাবাহিকতা বজায় থাকে। নতুন নামের আড়ালে, মাইশা গ্রুপ তার একক গ্রাহক ঋণের সীমা এড়িয়ে আরও বেশি ঋণ সংগ্রহ করতে সক্ষম হয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী,মন্যাশনাল ব্যাংক ঋণের ব্যবহার পর্যবেক্ষণের জন্য প্রকল্প সাইট পরিদর্শনের নির্দেশনা অমান্য করেছে। ঋণের অর্থ জমি কেনার জন্য ব্যবহৃত হয়েছে বলে সন্দেহ করা হয়।
তদন্তে আরও উঠে আসে যে, প্রকল্পের জন্য বরাদ্দ অর্থের বিপরীতে কোনো নির্মাণ কার্যক্রম বা কারখানার অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। ফলে বাংলাদেশ ব্যাংক ঋণ পুনরুদ্ধার এবং ঋণ প্রদানের সাথে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করে।
মাইশা গ্রুপের বর্তমান চেয়ারম্যান, প্রয়াত আসলামুল হকের স্ত্রী মাকসুদা হক জানান, “আসলামুল হকের মৃত্যুর পর মাইশা গ্রুপের কার্যক্রম সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গেছে। ঋণের পরিমাণ সম্পর্কে আমি পুরোপুরি জানি না। তবে আমরা আমাদের সম্পদ বিক্রি করে ঋণ পরিশোধ করতে চাই।”
ন্যাশনাল ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তৌহিদুল আলম খান বলেন, “মাইশা গ্রুপ আমাদের শীর্ষ খেলাপিদের একজন। আমরা ব্যাংকিং কোম্পানি আইন অনুসারে প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করছি।”
২০২২ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ন্যাশনাল ব্যাংকের মোট ঋণের পরিমাণ ছিল ৪২ হাজার ৫০৬ কোটি টাকা। যার মধ্যে ২৫.১০% অর্থাৎ ১০ হাজার ৬৭০ কোটি টাকা ছিল খেলাপি।
প্রতিষ্ঠার পরদিনই মানহা প্রিকাস্ট মাত্র ১০ লাখ টাকার পরিশোধিত মূলধন দেখিয়ে ২৩৬ কোটি টাকা টার্ম লোন এবং ১১৬ কোটি টাকা কার্যকরী মূলধনের ঋণ পায়। ঋণের বিপরীতে জমি মূল্যায়নের সনদ প্রদান করা হয়েছিল তৃতীয় পক্ষের জমি দেখিয়ে, যা তাত্ক্ষণিকভাবে সম্পন্ন হয়।
পুনঃব্র্যান্ডিংয়ের পর, ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে ডেকিং স্মার্ট ব্যাটারি প্রকল্পের জন্য ১৩০ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছিল। তবে এই অর্থ নির্মাণকাজে ব্যবহৃত না হয়ে সরাসরি নগদে উত্তোলন করা হয়।
মাইশা গ্রুপের অন্তর্গত বিভিন্ন শেল কোম্পানির মাধ্যমে ন্যাশনাল ব্যাংক থেকে নেওয়া ঋণের পরিমাণ প্রায় ৪ হাজার ২৩৬ কোটি টাকা। এর মধ্যে সিএলসি পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেড, ঢাকা নর্থ পাওয়ার ইউটিলিটি কোম্পানি লিমিটেড এবং মাহিম রিয়েল এস্টেট লিমিটেডের নাম রয়েছে।
এই ঋণের পরিমাণ সুদসহ আরও বৃদ্ধি পেয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ন্যাশনাল ব্যাংকের ঋণ বিতরণ প্রক্রিয়ায় এত বড় অনিয়ম দেশের ব্যাংকিং খাতের সামগ্রিক পরিস্থিতির ওপর গভীর প্রভাব ফেলেছে। সময়মতো পদক্ষেপ না নিলে এই ধরনের কেলেঙ্কারি দেশের আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা আরও বিপন্ন করতে পারে।

