জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সেল (সিআইসি) সামিট গ্রুপের দুটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ১ হাজার ১১২ কোটি টাকা কর ফাঁকির অভিযোগ তুলেছে। এই অভিযোগ ঘিরে তৈরি হয়েছে নানা প্রশ্ন এবং তদন্তে উঠে আসা তথ্য প্রমাণ করেছে বড় ধরনের আর্থিক অনিয়মের সম্ভাবনা।
তদন্তে জানা গেছে, সামিট করপোরেশন লিমিটেড এবং সিঙ্গাপুরভিত্তিক সামিট পাওয়ার ইন্টারন্যাশনাল, দুটি প্রতিষ্ঠানই লভ্যাংশ বিতরণের সময় যথাযথ উৎসে কর কর্তন করেনি। এতে সরকারের বিপুল পরিমাণ রাজস্ব ক্ষতি হয়েছে বলে দাবি করেছে এনবিআর।
সামিট গ্রুপের একজন মুখপাত্র বলেছেন, “আমরা এখনও এনবিআর থেকে কোনো নোটিশ পাইনি। সামিট কখনো কর ফাঁকি দেয়নি। আমরা সবসময় দেশের আইন মেনে চলি এবং নোটিশ পেলে যথাযথভাবে সহযোগিতা করব।”
সিআইসি’র অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ২০১৯-২০ অর্থবছর থেকে ২০২৩-২৪ অর্থবছর পর্যন্ত সামিট পাওয়ার লিমিটেড, সামিট করপোরেশন লিমিটেডকে লভ্যাংশ প্রদান করেছে উৎসে কর কর্তন না করেই। এতে প্রায় ৩১৮.৩৪ কোটি টাকা কর ফাঁকি হয়েছে। জরিমানা মিলিয়ে এই অঙ্ক বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৬৫.০৭ কোটি টাকায়।
অন্যদিকে সামিট করপোরেশন লিমিটেড ২০১৮-১৯ অর্থবছর থেকে ২০২২-২৩ অর্থবছর পর্যন্ত সিঙ্গাপুরভিত্তিক সামিট পাওয়ার ইন্টারন্যাশনালকে লভ্যাংশ প্রদানের সময় উৎসে কর কাটেনি। এতে ৪৩৭.৬৫ কোটি টাকা কর ফাঁকি হয়েছে। জরিমানা যোগ করে এই অঙ্ক এখন ৬৪৭.৭৩ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে।
তদন্তে আরও জানা যায়, পূর্ববর্তী প্রশাসন সামিট করপোরেশন এবং সামিট পাওয়ার ইন্টারন্যাশনালকে উৎসে কর ছাড়ের সুবিধা দিয়েছিল। তবে এনবিআরের মতে, এসব ছাড় আইনগত ভিত্তিহীন এবং বৈষম্যমূলক।
এনবিআর’র ট্যাক্স জোন-২-এর কর কমিশনার ব্যারিস্টার মুতাসিম বিল্লাহ ফারুকি বলেন, “এসব কর ছাড় কোনো বৈধ নথির মাধ্যমে নিশ্চিত করা যায়নি। আমরা এগুলো পুনর্মূল্যায়নের সুপারিশ করেছি।”
তদন্তের ভিত্তিতে এনবিআর সামিট গ্রুপের উৎসে কর ছাড় বাতিল করেছে। নতুন নির্দেশনায় বলা হয়েছে, সামিট পাওয়ার লিমিটেড লভ্যাংশ প্রদানের সময় ২০% এবং বাংলাদেশ-সিঙ্গাপুর দ্বৈত কর পরিহার চুক্তি অনুযায়ী সামিট করপোরেশন সিঙ্গাপুরভিত্তিক সামিট পাওয়ার ইন্টারন্যাশনালকে লভ্যাংশ প্রদানের সময় ১৫% উৎসে কর কর্তন করবে।
এই সিদ্ধান্ত পেছনের তারিখ থেকে কার্যকর করে সরকার কর আদায়ের পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।
সামিট গ্রুপের চেয়ারম্যান মুহাম্মদ আজিজ খান এবং তার পরিবারের আর্থিক লেনদেনের ওপর বিশেষ নজরদারি আরোপ করা হয়েছে। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে তাদের অ্যাকাউন্ট সাময়িকভাবে ফ্রিজ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
বর্তমানে সামিট গ্রুপের অধীনে পরিচালিত ১৮টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের মধ্যে ৯২% উৎপাদনক্ষম। তবে গ্যাস সংকট ও সরকারের চাহিদার অভাবে কিছু কেন্দ্র বন্ধ রয়েছে।
সামিট গ্রুপের বিরুদ্ধে আনীত কর ফাঁকির অভিযোগের তদন্ত অব্যাহত রয়েছে। এনবিআর এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো এই বিষয়ে আরও তথ্য সংগ্রহ করছে। কর ফাঁকির বিষয়টি নিশ্চিত হলে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন এনবিআর কর্মকর্তারা।

