দেশজুড়ে গবাদিপশুর খাদ্যের মূল্যবৃদ্ধি এবং খড়ের তীব্র সংকটে বিপাকে পড়েছেন দেশের পশু খামারিরা। বন্যা, ধানের ফলন হ্রাস এবং চারণভূমির অভাব এই সংকটের মূল কারণ। বিশেষ করে লক্ষ্মীপুর, নওগাঁ, বগুড়া, কুড়িগ্রাম ও খুলনা অঞ্চলে খড়ের দাম নজিরবিহীনভাবে বেড়ে গেছে, যা সরাসরি মাংস ও দুধ উৎপাদনে প্রভাব ফেলছে।
লক্ষ্মীপুরে বর্তমানে প্রতি কেজি খড়ের দাম ৩০ টাকা, যা প্রতি মণে ১২০০ টাকায় দাঁড়িয়েছে। এ মূল্য ধানের বাজারমূল্যের চেয়েও বেশি। যেখানে এক মণ ধান বিক্রি হচ্ছে ১০০০ টাকায়। এমন অস্বাভাবিক দাম গত কয়েক দশকে দেখা যায়নি। নওগাঁ, বগুড়া এবং খুলনার কৃষকরাও একই পরিস্থিতির সম্মুখীন।
লক্ষ্মীপুরের এক কৃষক তার জমির খড় বিক্রি করেছেন ৭০ হাজার টাকায়, যেখানে ধান থেকে আয় হবে ৫০ হাজার টাকা। এ অঞ্চলের কৃষকরা খড় বিক্রি করে খুশি হলেও পশু খামারিরা ভয়াবহ সংকটে পড়েছেন। লক্ষ্মীপুরের খামারি ইউসুফ জানান, তার গরুগুলো অপুষ্টির কারণে দুর্বল হয়ে পড়েছে। খড় ও অন্যান্য খাদ্যের উচ্চমূল্যের কারণে তিনি গরু বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন, তবে তা লোকসান দিয়েই।
খড়ের বিকল্প হিসেবে দানাদার গোখাদ্যে ঝুঁকছেন অনেক খামারি। তবে এর দামও বেড়ে গেছে। বর্তমানে প্রতি কেজি দানাদার গোখাদ্যের দাম ৪৫ থেকে ৫০ টাকা। লাইভস্টক সার্ভিস প্রোভাইডার সমিতির সভাপতি মো. আলাউদ্দিন জানান, প্রতিটি ১০০ কেজি ওজনের গরুর জন্য দিনে চার থেকে পাঁচ কেজি দানাদার খাবার প্রয়োজন হয়। ফলে এই খাদ্যের বাড়তি খরচ খামার পরিচালনায় নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।
গত সেপ্টেম্বরে হওয়া বন্যা লক্ষ্মীপুরসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের চারণভূমি ও ঘাস উৎপাদন ধ্বংস করে দিয়েছে। লক্ষ্মীপুর জেলা প্রাণিসম্পদ অফিসের তথ্যমতে, বন্যায় জেলায় ১৩ হাজার ৭৯১ একর চারণভূমি এবং ১৫৩ একর ঘাসের জমি নষ্ট হয়েছে। একই সময়ে ৮০ শতাংশ জমিতে আমন ধান চাষ না হওয়ায় খড় উৎপাদনেও ঘাটতি দেখা দিয়েছে।
বগুড়ার এক খামারি যিনি নিউজিল্যান্ডে পড়াশোনা শেষে দেশে ফিরে খামার গড়েছেন। তিনি বলেন, “গরুর হজমশক্তি রক্ষায় খড় প্রয়োজনীয় কিন্তু দাম বেড়ে যাওয়ায় খামার পরিচালনায় ব্যয় অনেক বেড়ে গেছে। এতে দুধ ও মাংসের বাজারদরও বাড়বে।” বগুড়া জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা মো. আনিছুর রহমান জানান, খড় গবাদিপশুর জন্য অপরিহার্য হলেও এর উচ্চমূল্যের কারণে চাষিদের বিকল্প ঘাস চাষে উৎসাহিত করা হচ্ছে।
খড় সংকটের কারণে দুধ ও মাংস উৎপাদনে বিপর্যয়ের আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। লক্ষ্মীপুর জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তার তথ্যমতে, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে লক্ষ্মীপুরে ৩ লাখ ১৬ হাজার গরু এবং ৩৫ হাজার ৮০০ মহিষ উৎপাদিত হয়। তবে চলমান সংকটে উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অনেক কম হতে পারে। বিশেষ করে আগামী কোরবানির ঈদে এ প্রভাব আরও গভীর হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
প্রাণিসম্পদ বিশেষজ্ঞরা বেশি করে ঘাস চাষের পরামর্শ দিচ্ছেন। কাঁচা ঘাসের মাধ্যমে খড়ের ঘাটতি পুষিয়ে নেওয়া সম্ভব। লক্ষ্মীপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, এই মৌসুমে লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় কম জমিতে আমন ধান চাষ হওয়ায় সরবরাহ সংকট তৈরি হয়েছে। তাই খামারিদের ঘাস চাষে উদ্বুদ্ধ করার পাশাপাশি সরকারের তরফ থেকে খাদ্য সহায়তার প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
গবাদিপশুর খাদ্যের সংকট শুধু খামারিদের নয়, পুরো কৃষি ও প্রাণিসম্পদ খাতকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। খড়ের এই নজিরবিহীন মূল্যবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা না হলে দেশের দুধ ও মাংসের বাজারে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়বে। পাশাপাশি, ঘাস চাষ ও খাদ্য সরবরাহের সঠিক পরিকল্পনা এখন সময়ের দাবি।

