বাংলাদেশের এক জনপদের ছোট্ট গ্রাম থেকে উন্নত জীবনের স্বপ্ন বুকে নিয়ে পাড়ি জমানো যুবক আরমান মণ্ডলের জীবন আজ বিপন্ন। উন্নত বেতনের চাকরির প্রতিশ্রুতি দিয়ে তাঁকে পা ফেলতে বাধ্য করা হয় এক ভয়াবহ প্রতারণার ফাঁদে। ঢাকার বনানীতে অবস্থিত একটি এজেন্সির প্ররোচনায় সৌদি আরবে ওমরাহ ভিসার নামে নেওয়া হয় তাঁকে। সেখান থেকে শুরু হয় এক চরম বিপর্যয়ের গল্প। ওমরাহ ভিসার আড়ালে আরমানসহ আরো নয়জন তরুণকে পাঠানো হয় রাশিয়ার এক সংঘবদ্ধ চক্রের কাছে। সেখানে তাঁদের জোর করে যুদ্ধে অংশ নিতে বাধ্য করা হয়।
ড্রিম হোম ট্রাভেলস নামের একটি প্রতিষ্ঠান প্রথমে ফেসবুক ও স্থানীয় দালালদের মাধ্যমে বিজ্ঞাপন প্রচার করে। চটকদার বিজ্ঞাপনে বলা হয়, রাশিয়ার ক্যান্টনমেন্টে মালি ও বাবুর্চির কাজের সুযোগ রয়েছে। বেতন শুরু হবে দেড় হাজার ডলার বা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় এক লাখ আশি হাজার টাকা। মাত্র এক মাসের মধ্যে ভিসা প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে-এমন আশ্বাসে অনেক তরুণ প্রলুব্ধ হন।
এই প্রতিষ্ঠান প্রতারণার এক নিখুঁত পরিকল্পনা তৈরি করে। প্রথমে আরমানসহ কয়েকজন তরুণের সঙ্গে চুক্তি করা হয়। যেখানে তাঁদের কর্মী ভিসার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। চুক্তিপত্রে উল্লেখ ছিল, রাশিয়ার সেনা ক্যাম্পে কাজ দেওয়া হবে। যা মালি বা বাবুর্চি হিসেবে শুরু হবে। অথচ তাঁদের দেওয়া হয় এক মাসের পর্যটন ভিসা।
আরমানসহ ১০ জনকে প্রথমে সৌদি আরবে নিয়ে গিয়ে রাশিয়ান চক্রের কাছে বিক্রি করে দেওয়া হয়। সেখানে তাঁদের এক মাসের কমান্ডো প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। প্রশিক্ষণের শেষে তাঁরা বুঝতে পারেন, তাঁদের যুদ্ধের ময়দানে নামানো হবে। কিন্তু তখন আর পিছু হটার কোনো সুযোগ ছিল না। মারধর ও হুমকির মুখে তাঁরা বাধ্য হন যুদ্ধে অংশ নিতে।
আরমান মণ্ডল এক সংবাদ মাধ্যমে জানান, রাশিয়ার কমান্ডোদের নির্দেশে তাঁদের সামরিক পোশাক পরানো হয় এবং হাতে তুলে দেওয়া হয় অস্ত্র ও গোলাবারুদ। যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানোর আগে তাঁদের বোঝানোর চেষ্টা করেছিলেন যে, তাঁরা কর্মী ভিসায় এসেছেন এবং কোনোভাবেই যুদ্ধে অংশ নিতে চান না। তবে তাঁদের কথায় কেউ কর্ণপাত করেনি।
কিয়েভে ড্রোন হামলার সময় স্থলমাইন বিস্ফোরণে আরমান আহত হন। তাঁর চোখের সামনে থাকা একটি জিপে আটজন সঙ্গী মারা যান। নিজে মোটরসাইকেলে পেছনে থাকায় তিনি প্রাণে বেঁচে যান। বর্তমানে তিনি রাশিয়ার একটি সামরিক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
রাজবাড়ীর একটি গ্রামে বসবাসরত আরমানের বাবা-মা আজ গভীর শোকে নিমজ্জিত। ফাহিমা বেগম আরমানের মা, ছেলের নিরাপদ প্রত্যাবর্তনের জন্য সরকারের সাহায্য প্রার্থনা করছেন। তাঁর বাবাও হতাশা এবং দুশ্চিন্তায় ভারাক্রান্ত। পরিবারের দাবি, আরমানের মতো নিরীহ তরুণদের প্রতারণা করে যুদ্ধের ময়দানে পাঠানো একটি ঘৃণ্য অপরাধ।
ঢাকার বনানীতে অবস্থিত ড্রিম হোম ট্রাভেলসের অফিস জননী গ্রুপের অংশ হিসেবে কাজ করে। প্রতিষ্ঠানটি কোনো বৈধ রিক্রুটিং এজেন্সি নয়। এজেন্সির চেয়ারম্যান এম এম আবুল হাসান ও তাঁর সহযোগীরা স্থানীয় দালালদের মাধ্যমে তরুণদের প্রলুব্ধ করেন। তাঁদের উন্নত জীবনের স্বপ্ন দেখিয়ে আট লাখ টাকার বিনিময়ে বিদেশে পাঠানো হয়।
ফেসবুক পেজ এবং অন্যান্য প্রচারণায় প্রতিষ্ঠানটি উল্লেখ করে যে তারা বিভিন্ন দেশে চাকরির ব্যবস্থা করে থাকে। অথচ বাস্তবে এটি একটি ভয়াবহ প্রতারণার চক্র। এই চক্রের ফাঁদে পড়ে আরমানের মতো আরও আটজন তরুণ রাশিয়ায় গিয়ে যুদ্ধের ময়দানে নামতে বাধ্য হন।
ড্রিম হোম ট্রাভেলস কোনো নিবন্ধিত রিক্রুটিং এজেন্সি নয়। ওমরাহ ভিসার আড়ালে তরুণদের সৌদি আরবে নিয়ে যাওয়া এবং সেখান থেকে রাশিয়ায় পাচার করা মানবাধিকার লঙ্ঘনের শামিল। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি কার্যত যুদ্ধ পাচার।
রামরু (রেফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেটরি মুভমেন্ট রিসার্চ ইউনিট) এর প্রতিষ্ঠাতা ড. তাসনিম সিদ্দিকী বলেন, “এই ঘটনার জন্য দালাল ও এজেন্সিকে আইনের আওতায় আনতে হবে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে তদন্ত করে দায়ী ব্যক্তিদের কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করা উচিত।”
এই ঘটনা তরুণদের জীবনের ঝুঁকি ও মানবপাচারের বিপদকে সামনে নিয়ে এসেছে। প্রতারণার ফাঁদ থেকে তরুণদের রক্ষায় জনসচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে। একইসঙ্গে প্রশাসনের উচিত নিবন্ধনবিহীন এজেন্সিগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করা।
ড্রিম হোম ট্রাভেলসের কর্মকাণ্ড শুধু মানবপাচার নয় বরং এটি এক ভয়াবহ আন্তর্জাতিক চক্রের অংশ। ওমরাহ ভিসার নামে সৌদি আরবে তরুণদের পাঠানো। সেখান থেকে রাশিয়ার সংঘবদ্ধ চক্রের কাছে বিক্রি করা এবং শেষ পর্যন্ত তাঁদের যুদ্ধে বাধ্য করা—এই চক্রের প্রতিটি ধাপ পরিকল্পিত।
এই ধরনের কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতে হলে চক্রের অন্তর্ভুক্ত সদস্যদের স্থানীয় এবং আন্তর্জাতিক প্রভাব থাকতে হয়। সৌদি আরবে থাকা দালালদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ এবং রাশিয়ান চক্রের সঙ্গে সখ্যতা ছাড়া এমন কার্যক্রম সম্ভব নয়।
বাংলাদেশি তরুণদের সহজলভ্য লক্ষ্য বানানোর পেছনে কয়েকটি কারণ রয়েছে:
অর্থনৈতিক চাপ: বেকারত্বের চাপে তরুণরা ভালো বেতনের কাজের জন্য ঝুঁকি নিতে বাধ্য হন।
সচেতনতার অভাব: বিদেশে কর্মসংস্থানের প্রক্রিয়া ও প্রতারণার ধরন সম্পর্কে অনভিজ্ঞতা।
আইনের প্রয়োগে শৈথিল্য: ভুয়া রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর কার্যক্রম বন্ধে প্রশাসনিক ব্যর্থতা।
এই ধরনের প্রতারণার ফলে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সামাজিক ও মানসিক দিকগুলো ভয়াবহ। আরমানের বাবা-মায়ের মতো হাজারো পরিবার নিঃস্ব হয়ে পড়ে যখন তাদের প্রিয়জন হারিয়ে যায় কিংবা জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে থাকে। শুধু আর্থিক ক্ষতি নয়, এই ঘটনা পরিবারগুলোকে গভীর হতাশা ও লজ্জার মধ্যে ঠেলে দেয়।
তরুণদের জীবনে এই অভিজ্ঞতা গভীর মানসিক আঘাত সৃষ্টি করে। যুদ্ধক্ষেত্রের ভয়াবহতা, সহিংসতা এবং প্রাণ হারানোর আশঙ্কা তাদের মানসিক স্থিতিশীলতা ধ্বংস করে দেয়। দেশেও ফিরে আসতে পারলে এই তরুণরা সামাজিকভাবে হেয় প্রতিপন্ন হন। কারণ তাঁদের অনেকেই নিজেদের অবস্থান ব্যাখ্যা করতে পারেন না।
ড্রিম হোম ট্রাভেলসের মতো প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম বছরের পর বছর ধরে চললেও এদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এজেন্সিটি যদি নিবন্ধিত না হয়, তবে কীভাবে তারা অবাধে বিদেশে লোক পাঠানোর কাজ চালিয়ে যাচ্ছে?
বাংলাদেশের অভিবাসন নীতিমালার দুর্বলতাগুলোকে কাজে লাগিয়ে এই ধরনের প্রতিষ্ঠান কার্যক্রম চালিয়ে যায়। প্রয়োজনীয় তদারকির অভাব এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কিছু অসাধু সদস্যের সহযোগিতা এদের কার্যক্রম আরও শক্তিশালী করে।
এই ভয়াবহ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে কিছু কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন:
আইনের কঠোর প্রয়োগ: ভুয়া রিক্রুটিং এজেন্সি এবং তাদের সহযোগীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে।
জনসচেতনতা বৃদ্ধি: তরুণদের এবং তাদের পরিবারকে বিদেশে কর্মসংস্থান সংক্রান্ত প্রতারণার বিষয়ে সচেতন করতে হবে।
তদন্তের প্রক্রিয়া শক্তিশালী করা: অভিবাসন প্রক্রিয়ায় দুর্নীতি রোধে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রম তদারকি করতে হবে।
মানবিক সহায়তা: প্রতারণার শিকার হওয়া তরুণদের মানসিক স্বাস্থ্য পুনর্বাসন এবং আর্থিক সাহায্যের জন্য একটি ফান্ড তৈরি করা প্রয়োজন।
এই ঘটনা শুধু একটি প্রতারণা নয়; এটি মানবিক ও সামাজিক মূল্যবোধের ওপর আঘাত। উন্নত জীবনের আশায় স্বপ্ন দেখা তরুণদের জীবনকে ধ্বংস করার এই ধরনের কার্যক্রম বন্ধ করতে না পারলে এর পরিণতি আরও ভয়াবহ হবে।
আমাদের সরকার, প্রশাসন এবং সমাজের সচেতন অংশ যদি সম্মিলিতভাবে কাজ করে। তবে এমন প্রতারণা বন্ধ করা সম্ভব। তরুণদের সুরক্ষার জন্য প্রশাসনকে দায়িত্বশীল ভূমিকা নিতে হবে। পাশাপাশি পরিবারগুলোকে আরও সচেতন হতে হবে।
তরুণদের জন্য একটি নিরাপদ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করা শুধু সরকারের দায়িত্ব নয় বরং পুরো সমাজের কর্তব্য। আরমানের মতো নিরীহ তরুণদের আর যেন এমন প্রতারণার শিকার হতে না হয়। সে লক্ষ্যে আমাদের সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।

