বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার এক যুগেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও এখনো এটি পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের কাঠামো পায়নি। দীর্ঘদিন ধরে প্রশাসনিক ও শিক্ষকদের মধ্যে চলমান দ্বন্দ্বের কারণে একাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রমে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। এতে সেশনজট, অবকাঠামোগত সমস্যা ও শিক্ষার মান নিম্নমুখী হওয়ার মতো গুরুতর সংকট সৃষ্টি হয়েছে।
২০০৮ সালে প্রতিষ্ঠিত বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে এখন পর্যন্ত পাঁচজন উপাচার্য দায়িত্ব পালন করেছেন। কিন্তু প্রত্যেকেই কোনো না কোনো আন্দোলনের মুখোমুখি হয়েছেন। যার বেশিরভাগই শিক্ষকদের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব ও প্রশাসনিক ক্ষমতার দ্বন্দ্ব থেকে সৃষ্ট হয়েছে। শিক্ষক ও প্রশাসনের দ্বন্দ্ব শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে জড়াতে বাধ্য করেছে। ফলে একাডেমিক কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে।
সর্বশেষ উপাচার্য অধ্যাপক শুচিতা শরমিনের বিরুদ্ধে আন্দোলন আরও তীব্র হয়েছে। তাঁর পদত্যাগের দাবিতে একাধিকবার অফিস ও বাসভবনে তালা দেওয়া হয়েছে। এমনকি তাঁর বাসভবনের মূল ফটকও ভাঙচুর করা হয়েছে। প্রশাসনের বিভিন্ন সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে তাঁর সঙ্গে শিক্ষকদের একটি অংশের দূরত্ব তৈরি হয়েছে, যা একাডেমিক কার্যক্রমকেও প্রভাবিত করছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ে অভ্যন্তরীণ দলাদলি নতুন মাত্রা পায় যখন উপাচার্য ও সহ-উপাচার্যের মধ্যে দ্বন্দ্ব প্রকাশ্যে আসে। একাডেমিক কার্যক্রমের অগ্রগতি নিয়ে সহ-উপাচার্য একটি বৈঠকের আয়োজন করলে উপাচার্য সেটিকে ‘বিধিবহির্ভূত’ উল্লেখ করে চেয়ারম্যানদের অংশ না নেওয়ার নির্দেশ দেন। এই প্রশাসনিক বিভক্তি শিক্ষার্থীদের মধ্যে আরও অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রায় ১০ হাজার শিক্ষার্থী থাকলেও মাত্র দেড় হাজার শিক্ষার্থীর আবাসন সুবিধা রয়েছে। ২৫টি বিভাগের জন্য প্রয়োজনীয় ৭৫টি শ্রেণিকক্ষের বিপরীতে আছে মাত্র ৩৬টি। ফলে অধিকাংশ বিভাগে সেশনজট তীব্র হচ্ছে। সাধারণত ছয় মাস থেকে দেড় বছর পর্যন্ত সেশনজটের শিকার হচ্ছেন শিক্ষার্থীরা। যা তাদের মানসিক অস্থিরতা ও হতাশা বাড়িয়ে তুলছে।
রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের স্নাতক শিক্ষার্থী নাবিলা জান্নাত বলেন, “আমাদের বিভাগে ৪৫০ জন শিক্ষার্থী থাকলেও মাত্র একটি শ্রেণিকক্ষ রয়েছে। অন্য বিভাগের সঙ্গে ভাগাভাগি করে আরেকটি কক্ষে ক্লাস করতে হয়। কক্ষসংকটের কারণে ক্লাস কম হয়। ফলে সিলেবাস শেষ করা সম্ভব হয় না। এক বছরের সেশনজটে পড়ে গেছি, অথচ সমাধানের জন্য তেমন কোনো উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না।”
প্রতিষ্ঠার পর থেকে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি উপাচার্যকেই আন্দোলনের মুখে পড়তে হয়েছে। প্রথম উপাচার্য হারুন অর রশিদের মেয়াদে দুই দফা আন্দোলন হয়েছিল। দ্বিতীয় উপাচার্য এস এম ইনামুল হকের বিরুদ্ধে দুই দফায় আন্দোলন চলে, যার একটি টানা ৪৪ দিন স্থায়ী ছিল। এর জেরে শিক্ষা মন্ত্রণালয় তাঁকে তিন মাসের ছুটিতে পাঠায়, পরে তাঁর মেয়াদ শেষ হয়ে যায়।
এরপরের উপাচার্য মো. ছাদেকুল আরেফিনের সময়েও একাধিক আন্দোলন হয়, যা শেষ পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়ে। চতুর্থ উপাচার্য মোহাম্মদ বদরুজ্জামান ভূঁইয়াকে ছয় মাসের মাথায় পদত্যাগ করতে হয়। ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক শুচিতা শরমিন বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম নারী উপাচার্য হিসেবে যোগ দেন। তবে তাঁর নিয়োগের পর থেকেই শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের একটি অংশ তাঁর বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করে।
বিশ্ববিদ্যালয়ে কোষাধ্যক্ষ নিয়োগের পর পরিস্থিতি আরও জটিল হয়। ২০২৩ সালের ২৬ নভেম্বর আবু হেনা মোস্তফা কামাল খানকে কোষাধ্যক্ষ হিসেবে নিয়োগ দিলে শিক্ষকদের একটি অংশ তাঁকে আওয়ামী লীগের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তি আখ্যা দিয়ে তাঁর নিয়োগ বাতিলের দাবি জানায়। এক পর্যায়ে মন্ত্রণালয় পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মামুন অর রশিদকে নতুন কোষাধ্যক্ষ হিসেবে নিয়োগ দেয়।
একাডেমিক কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সাধারণ শিক্ষার্থীরা। কোভিড-১৯ মহামারির কারণে শিক্ষায় যে ক্ষতি হয়েছিল। তা কাটিয়ে ওঠার আগেই অভ্যন্তরীণ দলাদলি ও প্রশাসনিক অস্থিরতা নতুন সংকট তৈরি করেছে। আন্দোলনকারীদের অনেকেই মনে করেন, শিক্ষকদের ব্যক্তিগত স্বার্থ ও ক্ষমতার দ্বন্দ্বের কারণে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে ব্যবহার করা হচ্ছে কিন্তু এতে শিক্ষার্থীদের কোনো উপকার হচ্ছে না বরং ক্ষতি হচ্ছে।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের বরিশাল মহানগরের আহ্বায়ক ও বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের শিক্ষার্থী শহিদুল ইসলাম বলেন, “দাবিগুলো যৌক্তিক হলেও আন্দোলনকে যেভাবে পরিচালিত করা হচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন আছে। ফটক ভাঙা, তালা দেওয়া এগুলো কোনো সমাধান নয়।”
এ প্রসঙ্গে উপাচার্য শুচিতা শরমিন বলেন, “শিক্ষার্থীদের ২২ দফা দাবির বাস্তবায়নে আমরা কাজ করে যাচ্ছি। কিন্তু বারবার ইস্যু তৈরি করে আন্দোলন করাটা কাম্য নয়। এতে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার ক্ষতি হচ্ছে। প্রশাসনিক জটিলতা তৈরি হচ্ছে এবং উন্নয়ন কর্মকাণ্ড ব্যাহত হচ্ছে। প্রয়োজনে আমরা শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আরও আলোচনায় বসব। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের সুষ্ঠু পরিবেশ রক্ষা করাই আমাদের প্রধান লক্ষ্য।”
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা চাইছেন, প্রশাসনিক দ্বন্দ্ব ও ক্ষমতার লড়াইয়ের বাইরে রেখে শিক্ষাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হোক। অবকাঠামোগত সংকট, শিক্ষকদের দলাদলি ও একাডেমিক কার্যক্রমের স্থবিরতা কাটিয়ে কীভাবে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় একটি সত্যিকারের গবেষণা ও শিক্ষাকেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠবে, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সবাইকে দায়িত্বশীল হতে হবে। অন্যথায়, এই সংকট দীর্ঘায়িত হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার মান ও গ্রহণযোগ্যতা আরও প্রশ্নবিদ্ধ হবে।

