২০০৭ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে বাংলাদেশ বিমান ছিল একটি আদর্শ প্রতিষ্ঠানের প্রতীক। সে সময় বিমানের প্রতিটি কাজ ছিল স্বচ্ছ এবং জবাবদিহি ছিল অটুট।
কিন্তু গত কিছু বছরে বিশেষ করে বিমান বোর্ডের পুনর্গঠনের পর বিমানে স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহির অভাব লক্ষণীয় হয়ে উঠেছে। এমনকি যখন কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারী তদন্তে দোষী প্রমাণিত হন তখন তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিয়ে তাকে দোষমুক্ত করার জন্য আবারও পছন্দের লোক দিয়ে দ্বিতীয় তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়।
গত ১৫ বছর ধরে যেসব কর্মকর্তারা বিমানে নানা অনিয়মের সঙ্গে জড়িত ছিলেন তাদের অনেকেই বর্তমানে বিভিন্ন জায়গায় পুনর্বাসিত হচ্ছেন। বিমানের গাড়িচালক থেকে শুরু করে বিমানচালক পর্যন্ত অনিয়মে জড়িয়ে পড়ছেন ফলে বিমানের পরিবেশ একটি নৈরাজ্যের দিকে ধাবিত হচ্ছে।
বিমানের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক বিমানের নিজস্ব কর্মকর্তা হওয়ায় তিনি বিমানের প্রায় সবাইকেই চেনেন। তবে তার কর্মকাণ্ডে বিমানের কর্মীরা সন্তুষ্ট নন। তারা অভিযোগ করছেন যে, তিনি পুরোনো সুবিধাভোগীদের সুবিধাজনক জায়গায় চাকরি দেওয়ার জন্য উদ্যোগী। বিমানে বিভিন্ন ধরনের অনিয়মের সুষ্ঠু বিচার না হওয়ায় কর্মীদের মধ্যে অসন্তোষ বাড়ছে।
এর মধ্যে, মো. সুমন মিয়া নামের একজন কর্মচারী এসএসসি পাস সনদ দিয়ে ২০১৬ সালে ক্যাজুয়াল এমটি অপারেটর হিসেবে চাকরিতে যোগ দেন। তবে ২০২২ সালে তিনি এমটি অপারেটর হিসেবে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পান এবং অভিযোগ ওঠে যে, তিনি দুটি সনদ জমা দিয়েছেন যার একটি জাল। তদন্তে বেরিয়ে আসে যে, তার এসএসসি (ভোকেশনাল) সনদও জাল। এখন সুমন বিমানের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের গাড়ি চালাচ্ছেন।
অপরদিকে, বিমানের জুনিয়র শিডিউলিং অফিসার শফিকুর রহমান ২০২৩ সালে একটি অনিয়মের অভিযোগ তোলেন। তিনি জানান, ৫ এপ্রিল, ২০২৩ তারিখে এমটি অপারেটর মো. তারেক গাড়ি চালানোর সময় অতিরিক্ত জ্বালানি ব্যবহার করেছেন। তদন্তে তারেক দোষী সাব্যস্ত হলেও বিমানের কিছু কর্মকর্তা তার চাকরি রক্ষার জন্য দ্বিতীয় তদন্ত কমিটি গঠন করে এবং তাকে নির্দোষ প্রমাণ করার চেষ্টা করে।
বিমানে এমন অনেক কর্মকর্তা-কর্মচারী রয়েছেন যারা রাজনৈতিক পদ-পদবি ব্যবহার করে তাদের আধিপত্য বিস্তার করছেন। বাংলাদেশ বিমান এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের সভাপতি এটিএম সাজ্জাদুল আলম। যিনি একজন জুনিয়র অফিসার থেকে সহকারী ব্যবস্থাপক পদে পদোন্নতি পেয়েছেন। তিনি বিগত সময়ে ভিভিআইপি এবং মন্ত্রীদের প্রটোকল দেওয়ার জন্য ব্যস্ত ছিলেন।
বিমানে নানা অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে বিক্রয় ও বিপণন বিভাগের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে, বিশেষ করে বিদেশ পোস্টিং নিয়ে। অনেক কর্মকর্তাই তিন বছরের বাধ্যবাধকতা না মেনে বিদেশে দীর্ঘ সময় অবস্থান করে লাভবান হয়েছেন। এর মধ্যে এএফএম আনিসুর রহমান, মো. মেসবাহ উদ্দিন, শরীফুল আলম, রিয়াদ সোলায়মান এবং এ বি সিদ্দিকের মতো কর্মকর্তাদের বিদেশে বিভিন্ন শাখায় পদোন্নতি দেয়া হয়েছে যদিও নিয়ম অনুযায়ী তাদের দেশে ফিরে আসার কথা ছিল।
এসব ঘটনার পর বিমানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সফিকুর রহমানের কাছে প্রশ্ন করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি। এ সব বিষয়গুলো বিমানের পরিবেশ এবং কার্যক্রমে বিরূপ প্রভাব ফেলছে যা বিমানের কর্মী ও কর্মকর্তাদের মধ্যে হতাশা সৃষ্টি করছে এবং প্রতিষ্ঠানটির সুশাসনের জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

