রূপকথার গল্পকেও হার মানানোর মতো এক অদ্ভুত কাহিনী সৃষ্টি করেছে আড়াইহাজার উপজেলার ব্রাহ্মন্দী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান লাক মিয়া। তিনি ‘দুর্নীতির বরপুত্র’ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছেন যার ব্যাংক অ্যাকাউন্টে গত ১৬ বছরে লেনদেন হয়েছে সাড়ে ১৪ হাজার কোটি টাকা।
একটি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের অ্যাকাউন্টে এত বিপুল পরিমাণ অর্থের লেনদেন দেখে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ চমকে গিয়েছিল। অনুসন্ধানে নামা দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) কর্মকর্তাদের চোখ কপালে উঠে গেছে।
লাক মিয়া ছিলেন নারায়ণগঞ্জ-২ আসনের প্রভাবশালী আওয়ামী লীগ নেতা নজরুল ইসলাম বাবুর ঘনিষ্ঠ সহযোগী। তিনি এমপি বাবুর ‘ক্যাশিয়ার’ হিসেবে পরিচিত ছিলেন এবং স্থানীয়রা অভিযোগ করেন যে, এমপি নজরুল ইসলাম বাবু অবৈধ পথে উপার্জিত বিপুল পরিমাণ টাকা লাক মিয়ার মাধ্যমে বিদেশে পাচার করেছেন। এমপি বাবুর প্রভাবের কারণে লাক মিয়া নিজের অবৈধ আয়ের মাধ্যমে আঙুল ফুলে কলাগাছ হওয়ার মতো অবস্থায় পৌঁছেছিলেন।
বিগত সময়ে এমপি নজরুল ইসলাম বাবু আড়াইহাজারে বেশ কয়েকটি মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন করেন যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো বিষনান্দি ইউনিয়নে মেঘনা নদীর তীর ঘেঁষে ফলিত রসায়ন পুষ্টিবিজ্ঞান গবেষণা ইনস্টিটিউট, আড়াইহাজার পুরাতন বিমানবন্দরে কৃষি ইনস্টিটিউট ও ট্রেনিং সেন্টার এবং ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক ঘেঁষে সাত গ্রাম ইউনিয়নের পাঁচরুখী এলাকায় জাপান ইপিজেড। এসব প্রকল্পের জমি কেনা থেকে শুরু করে মাটি ভরাট এবং অন্যান্য কার্যক্রমে এমপি বাবু তার ঘনিষ্ঠ ঠিকাদারদের মাধ্যমে মোটা অঙ্কের কমিশন নিয়েছেন যা লাক মিয়ার ব্যাংক অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে বিদেশে পাচার করা হয়েছে।
দুদকের অনুসন্ধানে আরও তথ্য উঠে এসেছে যে, লাক মিয়া ৪৯টি ব্যাংক হিসাবে সাড়ে ১৪ হাজার কোটি টাকা লেনদেন করেছেন। চেয়ারম্যান পদে দায়িত্ব পালনকালে তার অ্যাকাউন্টে ৭ হাজার ১৮৮ কোটি ৮৬ লাখ ৫ হাজার ২০৮ টাকা জমা পড়েছে এবং ৭ হাজার ১৮৭ কোটি ৩২ লাখ ৪৭ হাজার ২৯৩ টাকা উত্তোলন করা হয়েছে। অর্থাৎ তার ব্যাংক হিসাবে মোট ১৪ হাজার ৩৭৬ কোটি ১৮ লাখ ৫২ হাজার ৫০১ টাকা লেনদেন হয়েছে।
দুদক জানায়, লাক মিয়া তার ব্যাংক অ্যাকাউন্টে অস্বাভাবিক এবং সন্দেহজনক লেনদেনের মাধ্যমে মানি লন্ডারিংয়ের অপরাধ করেছেন যা মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন ২০১২ এর অধীনে শাস্তিযোগ্য অপরাধ। তার আয় ও লেনদেনের মধ্যে কোনো সামঞ্জস্য পাওয়া যায়নি। দুদক মহাপরিচালক আক্তার হোসেন জানান, লাক মিয়া ঘুস, দুর্নীতি, ভিজিডি, ভিজিএফ, এলজিএসপি, টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজি, জমি দখল এবং মাদক ব্যবসা করে অর্জিত অর্থ ব্যাংক হিসাবে লেনদেন করেছেন।
লাক মিয়ার অবৈধ আয়ের উৎসের তথ্য চাঞ্চল্যকর। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে, তিনি ৪১ কোটি ৯৬ লাখ ১২ হাজার টাকা মূল্যের স্থাবর সম্পদ এবং ১৬ কোটি ৭৩ লাখ ৬৭ হাজার ১৪০ টাকার অস্থাবর সম্পদ অর্জন করেছেন, অথচ তার বৈধ আয়ের উৎস মাত্র ৩ কোটি ৪৬ লাখ ২৬ হাজার ১৮৯ টাকা। এর বাইরে থাকা ৫৫ কোটি ২৩ লাখ ৫২ হাজার ৯৫১ টাকার বৈধ উৎস পাওয়া যায়নি। দুদক তার বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছে।
দুদক আরও জানায়, লাক মিয়ার স্ত্রী মাহমুদা বেগমও বিপুল পরিমাণ অবৈধ সম্পদ অর্জন করেছেন। তার ৭ কোটি ৪৭ লাখ ৯৩ হাজার ৪২৪ টাকা মূল্যের স্থাবর সম্পদ এবং ৮ কোটি ৩৯ লাখ ১৩ হাজার ৭৯১ টাকার অস্থাবর সম্পদ রয়েছে, কিন্তু তার আয় ও সম্পদের মধ্যে কোনো সামঞ্জস্য নেই। ২০১৬-১৭ অর্থবছর থেকে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে মাহমুদা বেগম মৎস্য খাত থেকে ১১ কোটি ৩১ লাখ ৭৬ হাজার টাকা আয় দেখিয়েছেন কিন্তু সেই আয় সম্পর্কে কোনো দালিলিক প্রমাণ উপস্থাপন করতে পারেননি।
লাক মিয়া ২০১৩ সালে প্রথমবারের মতো এমপি নজরুল ইসলাম বাবুর সহায়তায় ব্রাহ্মন্দী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। এরপর তিনি তার প্রভাব খাটিয়ে পুরো ইউনিয়নবাসীকে ভয়ভীতি দেখিয়ে এক বিশাল ক্যাডার বাহিনী গড়ে তোলেন। তার সহায়তায় তিনি জমি দখল, টেন্ডারবাজি এবং নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হন। তার বিরুদ্ধে জমি দখল, নিরীহ মানুষের হয়রানি করার অভিযোগও রয়েছে।
শেষ পর্যন্ত, গত ২৫ ফেব্রুয়ারি পুলিশের হাতে গ্রেফতার হন লাক মিয়া। তিনি বর্তমানে কারাগারে বন্দি রয়েছেন। দুদক তার বিরুদ্ধে তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে এবং অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে মামলা দায়ের করেছে।

