নারীর প্রতি সহিংসতা বহু যুগ ধরে চলে আসছে। এর সঙ্গে আছে অধিকার বঞ্চনা। পুরুষতান্ত্রিক সমাজ নারীকে দমন করার নানা কৌশল চালিয়ে এসেছে। ধর্মীয় গোঁড়ামিও সেই ব্যবস্থার একটি অংশ। ফলে নারীকে নানাভাবে লাঞ্ছিত হতে হয়েছে। তাদের ওপর চালানো হয়েছে নির্যাতন, ধর্ষণ, হত্যা ও বৈষম্যের মতো নিষ্ঠুর ঘটনা।
নারীর প্রতি সহিংসতা বাড়ার পেছনে বড় কারণ হলো ধর্ষণ প্রতিরোধে রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরও সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়নি। রাজনৈতিক দলগুলো বরং নিজেদের স্বার্থ রক্ষা করতেই ব্যস্ত থেকেছে। ক্ষমতায় আসার পর তারা নিজেদের সুবিধার দিকেই মনোযোগ দিয়েছে। সাধারণ মানুষের ভাগ্য বদলায়নি।
নারীরা শিক্ষায়, মেধায়, দক্ষতায় এগিয়ে গেলেও বৈষম্য এখনো আছে। নির্যাতনও থেমে থাকেনি। যদিও বিভিন্ন সময় আইন হয়েছে কিন্তু তার সঠিক প্রয়োগ দেখা যায়নি। অপরাধীরা বারবার ক্ষমতাশালীদের ছত্রচ্ছায়ায় রেহাই পেয়েছে। একপর্যায়ে রাজনীতি অপরাধীদের জন্য আশ্রয়স্থল হয়ে ওঠে।
আশির ও নব্বইয়ের দশকে নারীদের বিরুদ্ধে ফতোয়ার প্রচলন বাড়ে। গ্রামে-গঞ্জে এসব ফতোয়া নারীদের বাধাগ্রস্ত করেছে। তাদের উপর চালানো হয়েছে নিপীড়ন ও নির্যাতন। তবে কিছু উন্নয়ন সংস্থা সেই সময় নারীদের সচেতন করতে কাজ করেছে। বিভিন্ন প্রশিক্ষণের মাধ্যমে নারীদের সংগঠিত করেছে। সাধারণত দরিদ্র ও নিরক্ষর নারীরাই ছিল এসব ফতোয়ার মূল লক্ষ্য। কিন্তু ধীরে ধীরে নারীরা ঘুরে দাঁড়িয়েছে। তারা আত্মনির্ভরশীল হতে শুরু করেছে।
নব্বইয়ের দশকের শেষ দিকে নারীদের বিজয় উৎসব করা নিষিদ্ধ করা হয়। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মৌলবাদীরা সেই ফতোয়া দেয়। তখনকার সরকার ১৪৪ ধারা জারি করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করে। কিন্তু তাতে নারীর অধিকার আরও বাধাগ্রস্ত হয়। সরকার মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কথা ভুলে গিয়েছিল। নারীর অধিকার রক্ষা না করেই তাদের নিরাপত্তার নামে দমন করা হয়েছিল।
তবে সেই নিষেধাজ্ঞা মানতে নারীরা রাজি হয়নি। তারা রাস্তায় নেমেছে, প্রতিবাদ করেছে। বিশেষ করে নব্বইয়ের দশকের শেষ দিকে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় নারীদের বিজয় উৎসব করার ওপর ফতোয়া জারি করা হয়। তখন সরকার ১৪৪ ধারা জারি করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করে। কিন্তু এতে নারীরা আরও ক্ষুব্ধ হয়। তারা দলে দলে রাস্তায় নেমে আসে। পুরুষরাও তাদের সঙ্গে ছিল।
সেদিন অনেক হতাহতের ঘটনা ঘটে। কিন্তু সেটাই ছিল নারীদের উৎসবে অংশগ্রহণের বিরুদ্ধে শুরু হওয়া এক নতুন বাধার সূচনা। এরপর একে একে নারীদের পয়লা বৈশাখ উদযাপনে বাধা দেওয়া হয়। কোথাও কোথাও তাদের হেনস্তা করা হয়। নিরাপত্তার অজুহাতে উৎসবের পরিবেশ নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চলে। অথচ এটি যে দেশের সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও কৃষ্টির ওপর সরাসরি আঘাত, তা কেউ বুঝতে চায়নি।
নারীর প্রতি সহিংসতা কমার বদলে বরং আরও বেড়েছে। ধর্ষণের শিকার হচ্ছে শিশুরাও। সাত মাসের শিশুও রেহাই পাচ্ছে না। পৈশাচিক উপায়ে ধর্ষণের পর হত্যা করা হচ্ছে। কিন্তু অপরাধীরা বারবার ক্ষমতার দাপটে পার পেয়ে যাচ্ছে। তাদের দেখে সমাজে নতুন অপরাধীর জন্ম হচ্ছে।
রাজনৈতিক প্রতিশোধ নিতেও নারীদের ওপর সহিংসতা চালানো হয়েছে। গ্যাং রেপের মতো ঘটনা রাজনৈতিক প্রতিহিংসার হাতিয়ার হয়ে উঠেছে। অপরাধীরা রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে রেহাই পেয়েছে বারবার। এককথায় পারিবারিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রতিশোধের শিকার হয়েছে নারী।
বর্তমান পরিস্থিতিও আশাব্যঞ্জক নয়। ধর্মীয় বিধিনিষেধের অজুহাতে নারীদের প্রকাশ্যে হেনস্তা করা হচ্ছে। এসব ঘটনার ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে, যা আগে দেখা যায়নি। সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা এখন আর কারও অগ্রাধিকার বলে মনে হয় না।
অনেকে ভেবেছিল, নতুন শাসনব্যবস্থায় ধর্ষণ ও নারী নির্যাতন কমবে। কিন্তু সেটাও হয়নি। বরং পরোক্ষভাবে রাজনৈতিক প্রভাব দেখা যাচ্ছে। ছাত্রদের একটি অংশ তো সরাসরি রাজনৈতিক দলের নাম ঘোষণা করে নির্বাচনে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। কেউ কেউ মনে করছে, এটি না হলে ভালো হতো। তারা শাসকদের জবাবদিহির মধ্যে রাখতে পারত।
অবশ্য এখন ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে আপসহীন আন্দোলন চলছে। কিন্তু তাতেও নারীদের ওপর সহিংসতা থামছে না। বরং ধর্মীয় ও সামাজিক নানা অজুহাতে নারীদের ওপর নতুনভাবে আঘাত আসছে। এটি একটি ভয়াবহ পরিস্থিতির ইঙ্গিত দিচ্ছে।
উন্নয়ন, পরিবর্তন বা সংস্কার—যাই বলি না কেন, জনগণের নিরাপত্তা ছাড়া কিছুই সম্ভব নয়। কন্যাশিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কারণ তারাই আগামী দিনের ভবিষ্যৎ। জাতির অস্তিত্ব রক্ষার জন্য তাদের সুরক্ষিত রাখতেই হবে। এর কোনো বিকল্প নেই।

