নাটোরের সিংড়া উপজেলায় ৩৭ লাখ টাকাসহ আটক হওয়া গাইবান্ধা এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী ছাবিউল ইসলাম দীর্ঘ ২১ বছর ধরে ঘুরেফিরে গাইবান্ধায় কর্মরত ছিলেন। দীর্ঘ সময় একই জেলায় দায়িত্ব পালন করায় তিনি ক্ষমতাশালী হয়ে ওঠেন এবং ঠিকাদারদের অভিযোগ অনুযায়ী, তার কাছে তারা কার্যত জিম্মি হয়ে পড়েন।
গাইবান্ধা এলজিইডির একাধিক ঠিকাদারের অভিযোগ, ছাবিউল ইসলাম ঘুষ ছাড়া কোনো ফাইল অনুমোদন করতেন না। এলজিইডি ও সাঘাটা উপজেলা প্রকৌশলীর কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, সিরাজগঞ্জ জেলার বাসিন্দা ছাবিউল ইসলাম রাজশাহীতে বিশাল বাড়ি করেছেন। ২০০৫ সালের ২১ ডিসেম্বর তিনি সাঘাটা উপজেলার প্রকৌশলী হিসেবে যোগ দেন এবং টানা ১৪ বছর ১ মাস ২২ দিন সেখানে দায়িত্ব পালন করেন। এরপর তিনি এলজিইডি গাইবান্ধা জেলা কার্যালয়ে জ্যেষ্ঠ সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে যোগ দেন এবং ১ বছর ৬ মাস ২৮ দিন দায়িত্ব পালন করেন। একই সময় তিনি সাঘাটা উপজেলার অতিরিক্ত দায়িত্বও পালন করেন।
২০২১ সালের ১২ সেপ্টেম্বর নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে বরিশালে যোগ দিলেও মাত্র ২৩ দিন পর তদবির করে আবারও গাইবান্ধায় বদলি নেন। ৭ অক্টোবর তিনি গাইবান্ধা এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে যোগ দেন এবং ৮ নভেম্বর পূর্ববর্তী নির্বাহী প্রকৌশলীর কাছ থেকে দায়িত্ব বুঝে নেন। তার ফলে তিনি প্রায় ২০ বছর ৯ মাস ১২ দিন গাইবান্ধায় কর্মরত থাকেন।
গাইবান্ধার ঠিকাদার ও কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ছাবিউল ইসলাম জাতীয় সংসদের সাবেক ডেপুটি স্পিকার ও গাইবান্ধা-৫ (সাঘাটা-ফুলছড়ি) আসনের সংসদ সদস্য প্রয়াত ফজলে রাব্বী মিয়ার ঘনিষ্ঠ ছিলেন। তার দাপটেই তিনি এত বছর ধরে একই জেলায় থাকার সুযোগ পেয়েছেন। ২০২২ সালে ফজলে রাব্বী মারা গেলেও তিনি ক্ষমতাসীন দলের ছত্রছায়ায় বহাল ছিলেন।
গাইবান্ধা সনাকের সদস্য সাখাওয়াত হোসেন বলেন, সরকারি বিধি অনুযায়ী একজন কর্মকর্তা টানা তিন বছরের বেশি একই কর্মস্থলে থাকতে পারেন না। দীর্ঘ সময় একই জেলায় থাকার কারণে তিনি অনিয়ম ও দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়েছেন।
গাইবান্ধার একাধিক ঠিকাদার নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, ছাবিউল ইসলাম প্রথম বিল সই করার সময় শতকরা ৫ ভাগ এবং চূড়ান্ত বিল সই করতে শতকরা ১০ ভাগ ঘুষ নিতেন। তিনি এলজিইডির বিভিন্ন প্রকল্প নির্মাণকাজে নিজের মনোনীত সরবরাহকারীদের কাছ থেকে ঠিকাদারদের নির্মাণ সামগ্রী নিতে বাধ্য করতেন।
গাইবান্ধা নাগরিক পরিষদের আহ্বায়ক সিরাজুল ইসলাম বাবু বলেন, কোনো কর্মকর্তা দীর্ঘ সময় এক এলাকায় থাকলে তার মধ্যে অসৎ উদ্দেশ্য থাকে।
এদিকে এসব অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা দাবি করে ছাবিউল ইসলাম বলেন, কাজ সঠিক থাকলে বিল অনুমোদন করা হয়। ঘুষ নেওয়ার কোনো প্রমাণ কেউ দিতে পারবেন না। তার বাবার মৃত্যুর পর সিরাজগঞ্জের জমি বিক্রির টাকাই তার কাছে ছিল বলে তিনি দাবি করেন।
তবে সিংড়া থানার ওসি মো. আসমাউল হক জানান, গত বৃহস্পতিবার রাতে গাইবান্ধা থেকে রাজশাহী যাওয়ার পথে যৌথ বাহিনী ছাবিউল ইসলামের গাড়ি তল্লাশি করে ৩৭ লাখ টাকা উদ্ধার করে। থানায় এ বিষয়ে সাধারণ ডায়েরি করা হয়েছে এবং উপপরিদর্শক রাজু আহমেদ তদন্ত করছেন।
তদন্ত কর্মকর্তা রাজু আহমেদ জানান, ছাবিউল ইসলাম দাবি করেছেন, টাকাগুলো জমি বিক্রির তবে এর কোনো বৈধ কাগজপত্র তিনি দেখাতে পারেননি। বিষয়টি দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) তদন্তের জন্য পাঠানো হয়েছে। আদালত ইতিমধ্যে এই অর্থ রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে। প্রতিবেদন পাওয়ার পর পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

