করোনার ভ্যাকসিন ক্রয়ের প্রক্রিয়া এবং এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দুর্নীতির অভিযোগে তদন্ত শুরু করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। বিশেষ করে বেক্সিমকো ফার্মার ভাইস চেয়ারম্যান সালমান এফ রহমান ও সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেকের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা একটি সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে ২২ হাজার কোটি টাকার দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে।
গোয়েন্দা অনুসন্ধানে প্রাথমিকভাবে অনিয়ম ও দুর্নীতির কিছু প্রমাণ পাওয়া গেছে, যার ভিত্তিতে দুদকের উপপরিচালক আফরোজা হক খানের নেতৃত্বে একটি অনুসন্ধান টিম গঠন করা হয়েছে। সোমবার (১৭ মার্চ) দুদকের মহাপরিচালক মো. আক্তার হোসেন এ তথ্য নিশ্চিত করেন। অনুসন্ধান টিমের সদস্যরা হলেন সহকারী পরিচালক বিলকিস আক্তার, উপসহকারী পরিচালক মো. জুয়েল রানা এবং কাজী হাফিজুর রহমান। তারা ইতিমধ্যেই প্রয়োজনীয় নথিপত্র সংগ্রহের কাজ শুরু করেছেন।
অভিযোগের মধ্যে প্রধান বিষয় হচ্ছে, করোনার ভ্যাকসিন ক্রয়ের জন্য যে চুক্তি করা হয়েছিল তাতে সরকার এবং বেক্সিমকো ফার্মার মধ্যকার ট্রানজ্যাকশনের স্বচ্ছতা ছিল না। ২০২০ সালের ডিসেম্বরে ভারতীয় সেরাম ইনস্টিটিউট থেকে অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকা ভ্যাকসিনের তিন কোটি ডোজ কেনার জন্য চুক্তি করা হয় যেখানে বেক্সিমকো ফার্মা একটি মধ্যস্থতাকারী হিসেবে যুক্ত ছিল।
অভিযোগ রয়েছে যে, সরকারি ক্রয় বিধি অনুসরণ না করে, নীতিমালা লঙ্ঘন করে এবং দর-কষাকষির নিয়ম না মেনে টিকা আমদানি করা হয়। এর ফলে তৃতীয় পক্ষকে লাভবান হওয়ার সুযোগ তৈরি হয় যা সরকারের জন্য ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। সরকারের সরাসরি সেরাম ইনস্টিটিউটের সঙ্গে চুক্তি করলে প্রতি ডোজে যে পরিমাণ অর্থ বাঁচানো যেত তা দিয়ে আরও ৬৮ লাখ টিকা কেনা সম্ভব ছিল।
দুদক সূত্রে আরো জানানো হয়েছে, বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস ভারতের সেরাম ইনস্টিটিউট থেকে অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকা কোভিড ভ্যাকসিনের ৭০ মিলিয়ন ডোজ আমদানি করে যার মোট খরচ ছিল প্রায় ২ হাজার ১৭৫ কোটি টাকা। প্রতিটি ডোজ থেকে বেক্সিমকো প্রায় ৭৭ টাকা লাভ করেছে। একইভাবে চীন থেকে সিনোফার্মার ৩.১৫ মিলিয়ন ডোজ ভ্যাকসিন আমদানি করতে ২৭.৪৭৫ বিলিয়ন টাকা খরচ হয় যেখানে প্রতি ডোজের মূল্য ছিল প্রায় ১০০ ডলার। তবে সরকারি কমিটি ১৫ মিলিয়ন ডোজ সিনোফার্মার ভ্যাকসিনের প্রতি ডোজ ১০ ডলারে কেনার অনুমোদন দেয়, যার ফলে বড় ধরনের আর্থিক দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে।
তদন্তের সূত্রে আরো জানা গেছে যে, করোনার ভ্যাকসিনের ক্রয় প্রক্রিয়ায় সালমান এফ রহমান এবং জাহিদ মালেকের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা একটি সিন্ডিকেট দায়ী ছিল। এ সিন্ডিকেটে ছিলেন তৎকালীন স্বাস্থ্য সচিব লোকমান হোসেন, বাংলাদেশ চিকিৎসা গবেষণা পরিষদের (ডিএমআরসি) চেয়ারম্যান মোদাচ্ছের আলী এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব আহমদ কায়কাউস। এই সিন্ডিকেটের প্রভাবে বঙ্গভ্যাক্সের উন্নয়ন ও বাজারজাতকরণে বাধা সৃষ্টি হয়।
সিন্ডিকেটের একতরফা প্রভাবের কারণে গ্লোব বায়োটেকের বঙ্গভ্যাক্সের ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের অনুমোদন বিলম্বিত হয়। পরে একটি আনঅফিসিয়াল মিটিংয়ে বেক্সিমকো গ্রুপ দাবি করে, তারা গ্লোব বায়োটেকের সঙ্গে প্রযুক্তি শেয়ার করবে এবং জয়েন্ট ভেঞ্চারে বঙ্গভ্যাক্স বাজারজাত করবে। কিন্তু গ্লোব বায়োটেকের সঙ্গে একমত না হওয়ায় সেরাম ইনস্টিটিউটের সঙ্গে চুক্তি করা হয় যার ফলে বঙ্গভ্যাক্সের অনুমোদন আর দেওয়া হয়নি এবং প্রতিষ্ঠানটির প্রায় ৪০০ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে।
এখন দুর্নীতি দমন কমিশন এই সমস্ত অভিযোগের ওপর অনুসন্ধান চালিয়ে যাচ্ছে এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য অনুসন্ধান টিম কাজ করছে।

