বন্ড-সুবিধার আওতায় আমদানি করা কাঁচামাল ও সুতার অপব্যবহার করে সরকারকে হাজার হাজার কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকি দেওয়া হচ্ছে। বাংলাদেশ পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চের (এসবি) এক গোয়েন্দা প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যে, কীভাবে অতিরিক্ত ওয়েস্টেজ দেখিয়ে কাপড় ও সুতা আমদানি করা হয় এবং পরে তা খোলাবাজারে বিক্রি করে দেওয়া হয়। সম্প্রতি জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান বরাবর পাঠানো ওই প্রতিবেদনে এসব তথ্যের পাশাপাশি বেশ কিছু সুপারিশও করা হয়েছে।
একটি শার্ট তৈরির জন্য গড়ে ১.৭৫ ইয়ার্ড কাপড়ের প্রয়োজন হলেও ৩০ শতাংশ ওয়েস্টেজ দেখিয়ে ২.৭৫ ইয়ার্ড কাপড় আমদানি করা হয়। এই অতিরিক্ত কাপড় কৌশলে বাজারে বিক্রি করা হয়। একইভাবে সুতা আমদানির ক্ষেত্রেও ওয়েস্টেজ বেশি দেখিয়ে অতিরিক্ত সুতা আনা হচ্ছে। পরে এসব সুতা নরসিংদী, সিরাজগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন মার্কেটে বিক্রি হয়ে যায়।
এছাড়া অসাধু আমদানিকারকেরা কাপড়ের স্যাম্পল পরিবর্তন করে দামি কাপড় আমদানি দেখিয়ে কিংবা ওজনে কারচুপি করে অতিরিক্ত পণ্য আনেন। আবার কিছু গার্মেন্টস মালিক নামমাত্র ২০-২৫টি মেশিন বসিয়ে ও ভুয়া উৎপাদন দেখিয়ে বন্ড-সুবিধার আওতায় আমদানি করা কাপড়, সুতা ও অন্যান্য সামগ্রী খোলাবাজারে বিক্রি করে দেন। এতে কাস্টমস কর্মকর্তাদের একাংশও সহযোগিতা করছে।
বন্ড-সুবিধায় আমদানিকৃত কাপড় ও সুতা চট্টগ্রামের টেরিবাজার থেকে সরাসরি ঢাকা ও চট্টগ্রামের বিভিন্ন মার্কেটে চলে যায়। কেরানীগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ ও নরসিংদীতে রাতে গাড়ি আনলোড করে এসব কাঁচামাল মজুত করা হয়। পরে সুবিধামতো সময়ে ইসলামপুর, সদরঘাটসহ বিভিন্ন বাজারে সরবরাহ করা হয়। গার্মেন্টসের উৎপাদনের নামে আনা কাঁচামাল এসব বাজার থেকে দেশের বিভিন্ন অসাধু ব্যবসায়ীদের কাছে চলে যায়।
গোয়েন্দা প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, ভারত ও চীন থেকে আসা বন্ড-সুবিধার পণ্য প্রথমে চট্টগ্রামের টেরিবাজারে খালাস করা হয়। এরপর তা ওয়্যারহাউজে না নিয়ে সরাসরি ঢাকার ইসলামপুর, বিক্রমপুর সিটি গার্ডেন মার্কেট, নূর ম্যানশন, সাউথ প্লাজা, গুলশান আরা সিটি, মনসুর ক্যাসেল, কে হাবিবুল্লাহ মার্কেট ও ইসলাম প্লাজায় পাঠানো হয়।
গোয়েন্দারা পর্যবেক্ষণে দেখেছেন, আমদানিকারকেরা অধিক পরিমাণ ওয়েস্টেজ দেখিয়ে অতিরিক্ত কাপড় আমদানি করেন এবং তা বাজারে বিক্রি করে দেন। কেউ কেউ স্যাম্পল পরিবর্তন করে দামি কাপড় আমদানি করেন যা এনবিআর কর্মকর্তারা যথাযথভাবে যাচাই করেন না। ওজনে কারচুপি করে এলসিতে উল্লেখিত পরিমাণের চেয়ে বেশি পণ্য আনা হয় এবং অতিরিক্ত পণ্যের মূল্য হুন্ডির মাধ্যমে বিদেশে পাঠানো হয়।
সুতা আমদানির ক্ষেত্রেও একই ধরনের প্রতারণা করা হয়। কার্টনে সুতা আমদানির সময় গ্রেড পরিবর্তন করা হয়, যেমন ৩০ কাউন্টের ঘোষণা দিয়ে ৮০ কাউন্টের দামি সুতা আনা হয়। যার ৬০-৭০ শতাংশ খোলাবাজারে বিক্রি হয়ে যায়।
গোয়েন্দা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশের অধিকাংশ গার্মেন্টস মালিক চোরাচালানের সঙ্গে জড়িত। তারা উৎপাদনের প্রয়োজনের তুলনায় বেশি কাঁচামাল আমদানি করে অবৈধভাবে বিক্রি করেন। এমনকি কিছু কারখানা বন্ধ থাকলেও বন্ড লাইসেন্স কার্যকর দেখিয়ে সুবিধা আদায় করে নিচ্ছে। বন্ড কমিশনারেটের কিছু দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মকর্তার সহায়তায় এসব অনিয়ম হচ্ছে। তারা আমদানিকারকদের অতিরিক্ত পণ্য খালাসের অনুমোদন দিয়ে সহযোগিতা করছেন। আবার নিরীক্ষা বিভাগ অনৈতিক সুবিধা নিয়ে যথাযথ নিরীক্ষা না করায় চোরাচালানের সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে।
গোয়েন্দা প্রতিবেদনে এ সমস্যা সমাধানে চারটি সুপারিশ করা হয়েছে:
১. অটোমেশন সফটওয়্যার চালু করা: এনবিআরের অধীনে অটোমেশন সফটওয়্যার চালু করে আমদানি করা কাঁচামালের সঙ্গে রপ্তানি সামঞ্জস্য রেখে অনিয়ম পর্যবেক্ষণ করতে হবে।
২. নিয়মিত নিরীক্ষা ও পরিদর্শন: বন্ড লাইসেন্সধারী প্রতিষ্ঠানগুলোর ওয়ারহাউজ আকস্মিক পরিদর্শন এবং প্রতি তিন মাস অন্তর নিরীক্ষা করতে হবে।
৩. সঠিকভাবে স্যাম্পল যাচাই: এলসি খোলার সময় কাপড়ের স্যাম্পল যুক্ত করতে বাধ্য করা এবং আমদানি করা পণ্যের গ্রেড যাচাইয়ে অটোমেটেড মেশিন ব্যবহার করতে হবে।
৪. নিয়ন্ত্রণ কমিটি গঠন: গার্মেন্টস পণ্য উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামালের নিরূপণে এনবিআর, বিজিএমইএ, বিকেএমইএ ও বিটিএমএ-এর সমন্বয়ে একটি কমিটি গঠন করতে হবে।
এনবিআর ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কঠোর হলে বন্ড-সুবিধার অপব্যবহার রোধ করা সম্ভব হবে। যা সরকারের রাজস্ব সুরক্ষা ও বৈধ ব্যবসার স্বার্থ রক্ষায় সহায়ক হবে।

