ঈদুল ফিতর বা ঈদুল আজহাসহ যেকোনো বড় উৎসব এলেই দেশের বাজারে বেড়ে যায় জাল টাকার ছড়াছড়ি। এ সময় উৎসবমুখর পরিবেশে কেনাকাটার মধ্যে সাধারণ মানুষের অসাবধানতার সুযোগ নিয়ে জাল টাকা কারবারিরা তাদের কার্যক্রম আরো বাড়িয়ে দেয়। এবারও ঈদুল ফিতরের কেনাকাটাকে টার্গেট করে বাজারে বিপুল পরিমাণ জাল নোট ছড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে।
এ বিষয়ে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) দুইটি অভিযানে প্রায় ৮০ লাখ টাকার জাল নোটসহ দুটি চক্রের পাঁচ সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের জিজ্ঞাসাবাদে জানা গেছে, ধরা পড়ার আগেই তারা দুই দফায় ৫০ লাখ টাকার বেশি জাল নোট বাজারে ছড়িয়ে দিয়েছে।
এই জাল নোটের কারবার বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমে আরো সক্রিয় হয়ে উঠেছে। ফেসবুক, টিকটক ও ইনস্টাগ্রামের মতো প্ল্যাটফর্মে চটকদার বিজ্ঞাপন দিয়ে জাল টাকার ব্যবসা চলছে। এসব বিজ্ঞাপনে লোভনীয় অফারের মাধ্যমে নকল টাকার জন্য অর্ডার নেয়া হচ্ছে। দেশের যেকোনো প্রান্তে হোম ডেলিভারির সুবিধাও রয়েছে। এক লাখ টাকার জাল নোট বিক্রি হচ্ছে মাত্র ১০ হাজার টাকায়। বিশেষ করে ৫০, ২০০, ৫০০ ও ১০০০ টাকার নোট বেশি পরিমাণে জাল করা হচ্ছে বলে পুলিশের তদন্ত কর্মকর্তারা জানান।
ডিএমপির লালবাগ বিভাগের উপকমিশনার মো. জসিম উদ্দিন জানান, কামরাঙ্গীরচর থেকে একটি জাল নোট তৈরি চক্রের তিন সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের কাছ থেকে আরো অন্তত এক ডজন কারবারির নাম পাওয়া গেছে। তারা বর্তমানে পুলিশের নজরদারিতে রয়েছেন এবং যেকোনো সময় তাদের গ্রেপ্তার করা হবে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারা জানান, এসব চক্র উন্নতমানের ল্যাপটপ, প্রিন্টার, হিট মেশিন, স্ক্রিন, ডাইস, নিরাপত্তা সুতা, দামি কালি, আঠা ও স্কেল কাটারের মতো অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে নিখুঁতভাবে জাল টাকা তৈরি করে। এ ছাড়া গ্রাফিক ডিজাইন বিশেষজ্ঞরা জাল টাকার জলছাপসহ অন্যান্য নিরাপত্তা উপকরণ নকল করতে সাহায্য করে। জাল টাকা তৈরির এসব চক্র বছরে খুব বেশি সক্রিয় না থাকলেও ঈদ ও পূজার মতো বড় উৎসবের সময় তারা বিশেষভাবে কাজ করে। তারা টাকা ছাড়াও মার্কিন ডলার ও রুপি জাল করে থাকে। এ ধরনের অপরাধের সঙ্গে জড়িতদের গ্রেপ্তার করে ১৯৭৪ সালের বিশেষ ক্ষমতা আইনে মামলা করা হয়, তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তারা জামিনে বেরিয়ে আবারও একই কাজে জড়িয়ে পড়ে।
ডিএমপির গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) প্রধান অতিরিক্ত কমিশনার রেজাউল মল্লিক জানান, দেশীয় উৎসব শুরুর আগে জাল টাকার কারবারিরা সাধারণত সক্রিয় হয়ে ওঠে। যদিও পুলিশ নিয়মিত এসব চক্রের বিরুদ্ধে অভিযান চালায় তবে জাল টাকা ছড়ানোর কাজ বন্ধ হয় না। তাদের শনাক্ত করে গোয়েন্দা জালে নেওয়া হচ্ছে এবং অনেককে গ্রেপ্তারও করা হয়েছে। তবে এ সময় কিছু সদস্যকে নজরদারিতে রাখা হয়েছে।
জাল টাকার কারবারি চক্রের সদস্যরা সাধারণত তিন ভাগে কাজ করে থাকে। প্রথম ভাগে তারা অর্ডার অনুযায়ী জাল নোট তৈরি করে। দ্বিতীয় ভাগে সেই নোটটি ক্রেতার কাছে পৌঁছে দেয় এবং তৃতীয় ভাগে এগুলো বাজারে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। এ সময় এক লাখ টাকার জাল নোট তৈরি করতে খরচ হয় ৬ থেকে ৭ হাজার টাকা এবং ওই নোট পাইকারি ক্রেতাদের কাছে ৯ থেকে ১৫ হাজার টাকায় বিক্রি করা হয়। এরপর এই নোট খুচরা বাজারে বিক্রি হয়ে ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকায় পৌঁছে যায় এবং সবশেষে দোকানে গিয়ে নোটগুলো বাজারে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। এর মাধ্যমে এক লাখ টাকার জাল নোটের সমপরিমাণ লাভ হয়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে এসব জাল টাকার কারবারি চক্রগুলো তাদের নোট বিক্রি করে। বিভিন্ন সাইটে এমন পেজ খোলা হয়েছে যেখানে অনলাইনে জাল নোটের জন্য অর্ডার নেয়া হয় এবং হোম ডেলিভারির ব্যবস্থা করা হয়। এর মধ্যে ‘জাল টাকা বিক্রি করি’, ‘জাল টাকার ডিলার’, ‘জাল টাকার সেল গ্রুপ’ নামের পেজগুলো লক্ষ্য করা গেছে।
এসব চক্রের বিরুদ্ধে এখন পর্যন্ত একাধিক অভিযান পরিচালিত হলেও এসব কার্যক্রম বন্ধ হওয়ার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার এসএন মো. নজরুল ইসলাম বলেন, ‘‘যেকোনো বড় উৎসব এলেই এসব চক্র সক্রিয় হয়ে ওঠে। তারা সাধারণত অনলাইনে আকর্ষণীয় বিজ্ঞাপন দেয় তবে এসব বিজ্ঞাপনের ৯০ শতাংশই ভুয়া। আমরা এসব চক্রের বিরুদ্ধে অভিযান চালাচ্ছি এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিয়মিত নজরদারি রাখা হচ্ছে।’’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজ ও অপরাধ বিশ্লেষক ড. তৌহিদুল হক বলেন, ‘‘জাল টাকা বাজারে ছড়িয়ে দেওয়ার কারণে দেশের অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এ ধরনের চক্রগুলো সংঘবদ্ধ এবং তাদের দমন করতে হলে গোয়েন্দা নজরদারি বাড়াতে হবে।’’

