দেশের বিভিন্ন দেশীয় ও বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান ‘সেবা আমদানির’ নামে বছরের পর বছর বিপুল পরিমাণ রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে আসছে। এ বিষয়ে সম্প্রতি বৃহৎ করদাতা ইউনিট (এলটিইউ)-মূল্য সংযোজন করের এক অনুসন্ধানে চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ১৬টি প্রতিষ্ঠান তাদের ১০৬টি মাসিক দাখিলপত্রে (ভ্যাট রিটার্ন) প্রতিমাসে গড়ে ৩০ কোটি টাকা রাজস্ব ফাঁকি দিয়েছে যা বছরে দাঁড়ায় প্রায় ১৩৬ কোটি টাকা এবং পাঁচ বছরে এই ফাঁকির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৮২৫ কোটি টাকারও বেশি।
মূসক আইনের ব্যাখ্যা না নিয়েই প্রতিষ্ঠানগুলো একটি ‘ভুয়া’ ব্যাখ্যা ব্যবহার করে রাজস্ব ফাঁকি দিচ্ছে। এই ব্যাখ্যাটি এনবিআর থেকে নেওয়া হয়েছে বলে দাবি করা হলেও অনুসন্ধানে উঠে এসেছে যে, ব্যাখ্যাটি এনবিআর অনুমোদিত নয় বরং প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের স্বার্থ রক্ষার জন্য তৈরি করেছে। এমনকি কিছু প্রতিষ্ঠান অন্যদের দেখে অনুরূপ কৌশল অনুসরণ করে আসছে।
রাজস্ব ফাঁকির এই তালিকায় রয়েছে ইউনিলিভার, স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক, ম্যারিকো, গ্রামীণফোন, রবি, বাংলালিংক, নেসলে, স্কয়ার, ইনসেপ্টা, র্যাডিসন ব্লু, ইউনিক হোটেল, ব্র্যাক ব্যাংক, হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল, এসিআই ও এশিয়াটিক মাইন্ডশেয়ারসহ আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠান। এসব প্রতিষ্ঠান সেবা আমদানির নামে মূসক আইন লঙ্ঘন করে ‘উপকরণ রেয়াত’ গ্রহণ, প্রদেয় কর থেকে পরিশোধ দেখানোসহ নানা পদ্ধতিতে রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে আসছে।
এলটিইউর প্রতিবেদনে দেখা যায়, প্রতিমাসে ১৬টি প্রতিষ্ঠান গড়ে ৩০ কোটি ৪২ লাখ টাকা রাজস্ব ফাঁকি দিয়েছে যা বছরে দাঁড়ায় ৩৬৫ কোটি ১৩ লাখ টাকা এবং পাঁচ বছরে এই ফাঁকির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৮২৫ কোটি ৬৯ লাখ টাকা। প্রতিষ্ঠানভেদে রাজস্ব ফাঁকির পরিমাণ বিভিন্নভাবে নির্ধারিত হয়েছে। যেমন: এসিআই গ্রুপের অ্যাডভান্স কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড (এসিআই) ১১টি রিটার্নে গড়ে প্রতি মাসে ৫ লাখ ৪৭ হাজার টাকা রাজস্ব হানি হয়েছে যা বছরে দাঁড়ায় ৬৫ লাখ ৭৪ হাজার টাকা। এশিয়াটিক মাইন্ডশেয়ার দুইটি রিটার্ন যাচাই করে দেখা গেছে মাসে গড়ে ২ কোটি ৮৪ লাখ টাকা এবং বছরে ৩৪ কোটি ১৪ লাখ টাকা রাজস্ব ফাঁকি দিয়েছে। বাংলালিংক ডিজিটাল কমিউনিকেশন লিমিটেড চারটি রিটার্ন যাচাই করে দেখা যায়, মাসে গড়ে ১ কোটি থেকে ১.৫ কোটি টাকা এবং বছরে প্রায় ১৮ কোটি টাকা রাজস্ব হানি হয়েছে।
এছাড়া গ্রামীণফোন পিএলসি চারটি রিটার্নে ‘ফরেন পেমেন্ট’ দেখিয়ে মাসে গড়ে ১০ কোটি ২৮ লাখ টাকা এবং বছরে ১২৩ কোটি ৪১ লাখ টাকা রাজস্ব ফাঁকি দিয়েছে। রবি আজিয়াটা পিএলসি চারটি রিটার্নে ‘ফরেন টেকনিক্যাল সার্ভিস’ দেখিয়ে মাসে গড়ে ৫ কোটি ৪ লাখ টাকা এবং বছরে ৬০ কোটি ৫৪ লাখ টাকা ফাঁকি দিয়েছে। নেসলে বাংলাদেশ লিমিটেড তিনটি রিটার্নে ‘ইম্পোর্টেড সার্ভিস’ দেখিয়ে মাসে গড়ে ৬ কোটি ১১ লাখ টাকা এবং বছরে ৭৩ কোটি ৩৩ লাখ টাকা রাজস্ব ফাঁকি দিয়েছে। ইনসেপ্টা ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেড ১০টি রিটার্নে ‘ব্যাংক রিভার্স চার্জ ও ইম্পোর্ট সার্ভিস রিভার্স চার্জ’ দেখিয়ে বছরে ২৩ কোটি ১১ লাখ টাকা রাজস্ব ফাঁকি দিয়েছে।
এনবিআরের এক সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, যেসব কোম্পানির বিরুদ্ধে রাজস্ব ফাঁকির অভিযোগ উঠেছে সেটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। কারণ এনবিআর এসব প্রতিষ্ঠানকে নিয়ম মেনে চলা প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিবেচনা করে। সেবা আমদানির ক্ষেত্রে রাজস্ব নিয়ে মতপার্থক্য থাকতে পারে তবে নিজেদের স্বার্থে ভুয়া ব্যাখ্যা তৈরি করা এবং তা এনবিআরের অনুমোদিত বলে দাবি করা অত্যন্ত নিন্দনীয়। এনবিআর আইন অনুযায়ী এই প্রতিষ্ঠানগুলোর ফাঁকি দেওয়া রাজস্ব আদায় করবে এবং ভবিষ্যতে যাতে এ ধরনের ঘটনা না ঘটে সে জন্য কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
দেশীয় ও বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর এই রাজস্ব ফাঁকি অর্থনীতির জন্য বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। সরকারের কর ব্যবস্থাকে আরো শক্তিশালী করে এবং কড়া নজরদারি চালিয়ে এসব ফাঁকির পথ বন্ধ করা জরুরি। এনবিআরের উচিত কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করে এই বিপুল রাজস্ব ফাঁকির অর্থ আদায় করা, যাতে দেশীয় অর্থনীতি আরও স্বচ্ছ ও শক্তিশালী হয়।


