তাসের ঘরের মতো একের পর এক ভেঙে পড়ছে রাজনৈতিক বিবেচনায় লাইসেন্স পাওয়া ব্যাংকগুলো। অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণে ৯টি ব্যাংকের মধ্যে ৬টি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। বর্তমানে এসব ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ৮৬ থেকে ৮৮ শতাংশে পৌঁছেছে। খাতসংশ্লিষ্টরা জানাচ্ছেন, এসব ব্যাংক অনুমোদন পাওয়ার সময় ব্যাংক খাতের বিশেষজ্ঞরা বিরোধিতা করেছিলেন। কিন্তু সরকার তা উপেক্ষা করেছিল।
২০১৩ সালে নতুন ব্যাংকগুলোর প্রয়োজন না থাকার পরও রাজনৈতিক কারণে ৯টি ব্যাংকের অনুমোদন দেওয়া হয়। এই ব্যাংকগুলো হলো পদ্মা ব্যাংক (সাবেক ফারমার্স ব্যাংক), গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক (সাবেক এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংক), এনআরবি কমার্শিয়াল ব্যাংক, এনআরবি ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক, মেঘনা ব্যাংক, মধুমতি ব্যাংক, সাউথ বাংলা এগ্রিকালচার অ্যান্ড কমার্স ব্যাংক (এসবিএসি ব্যাংক) এবং মিডল্যান্ড ব্যাংক। এখন এসব ব্যাংকের আর্থিক অবস্থা সংকটপূর্ণ।
ফারমার্স ব্যাংক (বর্তমানে পদ্মা ব্যাংক) থেকে শুরু হয়েছিল এসব ব্যাংকে লুটপাট। আওয়ামী লীগ সরকারের তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ড. মহীউদ্দীন খান আলমগীরের নেতৃত্বে এই লুটপাট হয়। ২০১৭ সালে ব্যাংকটির পর্ষদ ভেঙে পুনর্গঠন করা হয়। ২০১৯ সালে ব্যাংকটির নাম পরিবর্তন করে পদ্মা ব্যাংক রাখা হয়। ২০২৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত পদ্মা ব্যাংক ৫ হাজার ৬২৮ কোটি টাকা ঋণ বিতরণ করেছে। এর মধ্যে ৪ হাজার ৮৭০ কোটি টাকা খেলাপি, যা বিতরণকৃত ঋণের ৮৬.৫৩ শতাংশ। বর্তমানে ব্যাংকটি বড় আমানতকারীদের টাকা ফেরত দিতে পারছে না।
সবচেয়ে বেশি লুটপাট হয়েছে ইউনিয়ন ব্যাংকে। ২০১৩ সালে প্রতিষ্ঠার পরই ব্যাংকটির চেয়ারম্যান হন এস আলম গ্রুপের শহীদুল আলম। এতে ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ চলে যায় এস আলম গ্রুপের কাছে। পরবর্তীতে ব্যাংকটির চেয়ারম্যান ও পরিচালকদের মধ্যে এস আলম পরিবারের সদস্যরা দায়িত্ব পালন করেছেন। ২০২৪ সালের ২৭ আগস্ট ব্যাংকটির পর্ষদ ভেঙে নতুন পর্ষদ গঠন করা হয়। এই নতুন পর্ষদে এক্সিম ব্যাংকের সাবেক এমডি মু. ফরীদ উদ্দিন আহমদ চেয়ারম্যান হন। ব্যাংকটির খেলাপি ঋণ ৮৮ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছেছে।
এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংক ২০১৩ সালে যাত্রা শুরু হয়, এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক ছিলেন প্রশান্ত কুমার (পিকে) হালদার। তিনি বহু টাকা লুটপাট করেন। ২০২১ সালে ব্যাংকটির নাম পরিবর্তন করে গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক রাখা হয়। ২০২৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক ১৪ হাজার ৩৯৭ কোটি টাকা ঋণ বিতরণ করেছে। এর মধ্যে ৮০ শতাংশ ঋণ নিয়ে গেছে এস আলম গ্রুপ। ব্যাংকটির খেলাপি ঋণ ৪ হাজার ৪৪৩ কোটি টাকা, যা বিতরণকৃত ঋণের ৩১ শতাংশ।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট তিনটি ব্যাংকের পর্ষদ ভেঙে দেওয়া হয়। এগুলো হলো মেঘনা ব্যাংক, এনআরবি ব্যাংক এবং এনআরবি কমার্শিয়াল ব্যাংক। এই ব্যাংকগুলোর পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে সুশাসন ফেরানোর জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক এই সিদ্ধান্ত নেয়। ২০১৩ সালে এগুলোও রাজনৈতিক বিবেচনায় অনুমোদন পেয়েছিল। বর্তমানে এসব ব্যাংকের আর্থিক অবস্থা খারাপ নয়।
মেঘনা ব্যাংকের চেয়ারম্যান ছিলেন আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতা এইচ এন আশিকুর রহমান। ব্যাংকটির বেশিরভাগ শেয়ার এখন তাদের পরিবারের হাতে। ব্যাংকটির খারাপ পরিস্থিতি হওয়ায় নতুন পরিচালকদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তারা হলেন উজমা চৌধুরী ও তানভীর আহমেদ। এছাড়া স্বতন্ত্র পরিচালক হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক দুই নির্বাহী পরিচালক মামুনুল হক ও রজব আলী নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। ২০২৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ব্যাংকটি ৬ হাজার ৭৪৫ কোটি টাকা ঋণ দিয়েছে। যার মধ্যে ২৫৫ কোটি টাকা খেলাপি।
এনআরবি ব্যাংকের চেয়ারম্যানসহ পরিচালকরাও সরকার বদলের পর আর দেশে ফিরে আসেননি। ব্যাংকটির পর্ষদ ভেঙে নতুন পরিচালক নিয়োগ করা হয়েছে। ২০১৩ সালে এই ব্যাংকটিও রাজনৈতিক বিবেচনায় লাইসেন্স পেয়েছিল। বর্তমানে ব্যাংকটির ঋণের ৬ দশমিক ৮৬ শতাংশ খেলাপি।
এনআরবি কমার্শিয়াল ব্যাংকের চেয়ারম্যান ছিলেন রাশিয়া আওয়ামী লীগের নেতা এসএম পারভেজ তমাল। বর্তমানে ব্যাংকটির চেয়ারম্যান আলী হোসেন প্রধানিয়া। ২০২৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ব্যাংকটির ঋণের ৫ দশমিক ৮৯ শতাংশ খেলাপি।
এছাড়া মধুমতি ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ১ দশমিক ৮৫ শতাংশ। মিডল্যান্ড ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ৩ দশমিক ৭৮ শতাংশ এবং এসবিএসি ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ৬ দশমিক ৮১ শতাংশ। এগুলোর খেলাপি ঋণের প্রকৃত চিত্র নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে বেরিয়ে আসবে, এমনটাই মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। ২০১৩ সালে এই তিনটি ব্যাংকও রাজনৈতিক বিবেচনায় অনুমোদন পেয়েছিল।
এভাবে, রাজনৈতিক কারণে লাইসেন্স পাওয়া এসব ব্যাংকগুলোর অবস্থা ক্রমশ দুর্বল হয়ে যাচ্ছে। অনিয়ম, দুর্নীতি ও ঋণের খেলাপি বিপুল পরিমাণে বাড়ছে। এসব ব্যাংকের বর্তমান অবস্থা দেশের ব্যাংকিং খাতের জন্য এক বড় ধরনের সংকট হয়ে দাঁড়িয়েছে।

