বর্তমানে দেশের বাজারে চালের সরবরাহ যথেষ্ট পরিমাণে রয়েছে এবং সরকারের গুদামে চালের মজুতও পর্যাপ্ত। তবে রমজান মাসে যেখানে ভোক্তা সাধারণ অন্যান্য পণ্যের দামে কিছুটা স্বস্তি পাচ্ছে সেখানে চালের বাজারে অস্থিরতা সৃষ্টি হচ্ছে। বিশেষ করে মিল মালিকদের একচেটিয়া বাজার ব্যবস্থাপনা এবং মুনাফালোভী কর্মকাণ্ডের কারণে চালের দাম বেড়ে চলেছে।
মিল মালিকরা রোজায় অতিরিক্ত মুনাফা অর্জনের লক্ষ্য নিয়ে মিনিকেট চালের দাম প্রতি বস্তায় (৫০ কেজি) ৫০০ টাকা বাড়িয়েছে। এই পরিস্থিতি খুচরা বাজারেও প্রতিফলিত হচ্ছে যেখানে কেজি প্রতি মিনিকেট চালের দাম ৯০ টাকা পর্যন্ত পৌঁছেছে। এতে সাধারণ ভোক্তাদের জন্য দামে স্বস্তি পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে।
গত কয়েক মাস ধরে চালের বাজারে অস্থিরতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। গত বছর ডিসেম্বরে মিল পর্যায়ে মিনিকেট চালের বস্তা ছিল ৩৩০০ টাকা যা জানুয়ারিতে বেড়ে ৩৯০০ থেকে ৪০০০ টাকায় পৌঁছায়। তবে কিছুটা দাম কমে ১৫ দিন আগে মিনিকেটের বস্তা বিক্রি হয়েছিল ৩৮৫০ টাকায়।
কিন্তু বর্তমানে সেই দাম বেড়ে ৪২০০-৪৪০০ টাকায় দাঁড়িয়েছে। এ ছাড়া অন্যান্য চালের দামও বৃদ্ধি পেয়েছে। ২৫ কেজির নাজিরশাইল চাল এখন ১৯০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, যা ১৫ দিন আগে ছিল ২০০০ টাকা। বিআর ২৮ জাতের চালের বস্তা বিক্রি হচ্ছে ২৭০০ টাকায় যা আগে ২৫০০ টাকায় বিক্রি হত। স্বর্ণা জাতের চালের দাম ২৪৫০ টাকা প্রতি বস্তা।
কাওরান বাজারের আল্লাহর দান রাইস এজেন্সির মালিক মো. সিদ্দিকুর রহমান জানিয়েছেন, বর্তমানে মিনিকেট চালের উৎপাদন কম হওয়ায় চারটি মিল কোম্পানি (তীর, মঞ্জুর, সারগর, এবং মোজাম্মেল) বাজারে দাম বাড়াচ্ছে। মিল মালিকদের চাপে পাইকারি আড়তদাররা নির্ধারিত দামে চাল কিনতে বাধ্য হচ্ছে। তিনি বলেন, “মিল পর্যায়ে তদারকি করা হলে দাম কমে আসবে।”
রাজধানীর খুচরা বাজারে গত বৃহস্পতিবার মিনিকেট চালের দাম কেজিপ্রতি ৮৫-৯০ টাকা ছিল। এক মাস আগেও এর দাম ছিল ৭৮-৮৪ টাকা। বিআর ২৮ জাতের চাল ৬৫ টাকা প্রতি কেজি আর স্বর্ণা জাতের চাল ৫৫-৫৬ টাকা প্রতি কেজি বিক্রি হচ্ছে।
মালিবাগ কাঁচাবাজারের খালেক রাইস এজেন্সির মালিক মো. দীদার হোসেন জানান, কিছু মিল মালিকের কারসাজির কারণে গত চার মাস ধরে বাজারে অস্থিরতা চলছে। এমন পরিস্থিতিতে মিল মালিকরা দাম বাড়িয়ে বিক্রি করছে এবং বাজার তদারকির অভাবেই এই অস্থিরতা চলতে থাকছে।
কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) ভাইস প্রেসিডেন্ট এসএম নাজের হোসাইন জানিয়েছেন, বাজারে বিভিন্ন সংস্থা তদারকি করলেও ভোক্তারা এর সুফল পাচ্ছেন না। পণ্যের দাম বাড়লেই প্রশাসন অভিযান পরিচালনা করলেও মিল মালিকদের স্তরে তদারকি না হওয়ার কারণে অসাধু ব্যবসায়ীরা দাম বাড়িয়ে ভোক্তাদের ক্ষতি করছে।
জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মোহাম্মদ আলীম আখতার খান জানিয়েছেন, নিয়মিত বাজারে অভিযান চালানো হচ্ছে এবং অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে।
সরকারের খাদ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, সরকারি গুদামে চালের মজুত বর্তমানে ৯ লাখ ৬৩ হাজার ৪৮৮ টন। এ ছাড়া, গমের মজুত রয়েছে ৩ লাখ ৯৫ হাজার ৮৬২ টন। এর মাধ্যমে চালের বাজারে স্থিতিশীলতা বজায় রাখার জন্য সরকার সচেষ্ট রয়েছে। আগামী মার্চ-এপ্রিল মাসে প্রায় ৭ লাখ টন চাল বিতরণ করার পরিকল্পনা রয়েছে যার মাধ্যমে দরিদ্র জনগণের খাদ্য সরবরাহ নিশ্চিত করা হবে।
তবে মিল মালিকদের অপ্রীতিকর কার্যকলাপের কারণে চালের দাম সঠিক মাত্রায় না আসা পর্যন্ত বাজারে অস্থিরতা থাকতে পারে। সরকারের উদ্যোগে চালের মজুত বাড়ানোর পাশাপাশি বিদেশ থেকে চাল আমদানি অব্যাহত রেখেছে যাতে বাজারে কোনো ধরনের সংকট তৈরি না হয়। আগামী বোরো মৌসুমে দেশের চালের উৎপাদন ভালো হতে পারে এবং তাতে দাম আরো কমে আসার সম্ভাবনা রয়েছে।
ফলে বর্তমানে চালের দাম কিছুটা বেড়েছে হলেও সরকারের কার্যকর পদক্ষেপ এবং খাদ্য মজুতের কারণে বাজারে খাদ্য সংকট হওয়ার সম্ভাবনা নেই।

