রাজধানীতে ফুটপাতে চাঁদাবাজি একসময় কমে গিয়েছিল। তবে এখন আবার তা ব্যাপকভাবে ফিরে এসেছে। গণঅভ্যুত্থানের পর হাসিনা সরকারের পতনের সময় ফুটপাতের চাঁদাবাজি প্রায় বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু খুব বেশিদিন এটি স্থায়ী হয়নি। বর্তমানে ফুটপাতে চাঁদাবাজি আবার পুরোনো রূপে ফিরেছে। নতুন হকাররা এসেছেন এবং চাঁদার পরিমাণ বেড়েছে। কিছু এলাকাতে বিএনপি নেতাকর্মীদের নামও এই চাঁদাবাজির তালিকায় যুক্ত হয়েছে। বেশ কিছু এলাকায় পুলিশের উপস্থিতি আগের চেয়ে কম দেখা যাচ্ছে।
ফুটপাত হকারমুক্ত করার চেষ্টা বহুবার করা হয়েছে কিন্তু তা সফল হয়নি। ২০১৬ সালের অক্টোবর মাসে গুলিস্তানকে হকারমুক্ত করার চেষ্টা করেছিলেন ঢাকা দক্ষিণের মেয়র সাঈদ খোকন। কিন্তু হকাররা এর বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিরোধ গড়ে তোলে এবং নগর ভবন ঘেরাও করে। এরপর থেকে হকার উচ্ছেদ কার্যক্রম থমকে যায়। ব্যারিস্টার তাপস মেয়র হওয়ার পরও রাস্তা থেকে হকারদের সরানোর চেষ্টা করা হয়েছিল কিন্তু সেও সফল হয়নি। এরপর গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে কিছুদিন ফুটপাতে দোকান উচ্ছেদ করা হয়েছিল কিন্তু এখন আবার দোকান বসতে দেখা যাচ্ছে।
২০১৬ সালে ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (বিআইজিডি) এর এক গবেষণায় জানা গেছে, ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের ৪৩০ কিলোমিটার রাস্তার উপর প্রায় ৩ লাখ হকার ব্যবসা করছেন। এসব হকারদের কাছ থেকে প্রতি বছর চাঁদা আদায় হয় প্রায় ১৮২৫ কোটি টাকা। ২০২০ সালে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের আরেক গবেষণায় জানানো হয়, প্রতিটি হকার গড়ে প্রতিদিন ১৯২ টাকা করে চাঁদা দেন।
রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ফুটপাতে চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণে বেশ কিছু শীর্ষ সন্ত্রাসী সক্রিয়। বিশেষ করে, সানজিদুল ইসলাম ইমন নামের এক শীর্ষ সন্ত্রাসী রাজধানীর আজিমপুর, নিউমার্কেট, সায়েন্স ল্যাব, এলিফ্যান্ট রোড, কাঁটাবনসহ বিভিন্ন এলাকায় হকারদের নিয়ন্ত্রণ করছেন। ইমনের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি পুরোনো দোকানি তুলে দিয়ে নতুন দোকান বসানোর জন্য ৫০ হাজার থেকে ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায় করেন। এছাড়া সায়েন্স ল্যাব, ধানমন্ডি হকার্স মার্কেট, এলিফ্যান্ট রোডে চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণ করছেন বিএনপির নেতা কে এম চঞ্চল।
গুলিস্তান, পল্টন, ফার্মগেট, মতিঝিল এবং মিরপুরের বিভিন্ন এলাকায় চাঁদাবাজি চলছে। গুলিস্তানে ২০ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক আবু সুফিয়ান এবং মিরপুরে হকার সমবায় সমিতির মাধ্যমে চাঁদাবাজি হচ্ছে। ফার্মগেটের সুইডেন আসলাম এবং মতিঝিলের ফেন্সি নাসিরের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে ফুটপাতে চাঁদাবাজি।
প্রশাসন ও রাজনৈতিক নেতাদের কাছে অভিযোগ পৌঁছানো হলেও কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া হয়নি। মিরপুরের বিএনপির নেতা তারেক ও অন্য নেতাকর্মীরা চাঁদাবাজির সঙ্গে যুক্ত থাকার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তবে স্থানীয় সন্ত্রাসী গোষ্ঠী ও রাজনৈতিক নেতাদের সরাসরি মদত রয়েছে তা পরিষ্কার।
ফুটপাতে চাঁদাবাজি ও হকারদের কাছ থেকে চাঁদা আদায় একটি বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, রাজনৈতিক মদত ছাড়া এই চাঁদাবাজি বন্ধ করা সম্ভব নয়। এটি একটি বিশাল সামাজিক ও অর্থনৈতিক সমস্যা সৃষ্টি করছে, যা দ্রুত সমাধান করা প্রয়োজন।

