দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও অর্থনৈতিক খাতে প্রভাবশালী কিছু ব্যক্তির আধিপত্য ও প্রভাব কমেনি। এস আলম, সালমান এফ রহমানসহ কয়েকজন ব্যবসায়ী এবং শীর্ষ প্রশাসনিক কর্মকর্তা এখনো দেশের আর্থিক খাতের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলো নিয়ন্ত্রণ করছেন। তারা পূর্ববর্তী সরকারের আমলে গুরুত্বপূর্ণ পদে থেকে সুবিধা ভোগ করলেও বর্তমান প্রশাসনেও তারা ক্ষমতাশালী অবস্থানে রয়েছেন।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগের সচিব মো. খায়েরুজ্জামান মজুমদার ২০২৩ সালের আগস্টে পদে আসীন হন যা আগের সরকারের আমলে ছিল। একইভাবে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব নাজমা মোবারেক ২০২৪ সালের ৩০ অক্টোবর অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে দায়িত্ব পেলেও তিনি ২০২৩ সালে আগের সরকারের আমলে সচিব হিসেবে পদোন্নতি পান।
শেখ হাসিনার ঘনিষ্ঠ কর্মকর্তা হিসেবে পরিচিত আবদুর রহমান খান বর্তমানে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি আগের সরকারের আমলে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব হিসেবে দায়িত্বে ছিলেন এবং পরবর্তীতে অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে এনবিআরের চেয়ারম্যান পদে নিয়োগ পান।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিব মুসলিম চৌধুরী শেখ হাসিনার ঘনিষ্ঠ ছিলেন এবং তার পরামর্শেই মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ দেওয়া হতো বলে জানা যায়। ২০১৭ সালে তিনি অর্থ সচিবের দায়িত্ব পান এবং পরে মহা হিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক (সিএজি) হিসেবে নিয়োগ পান। ২০২২ সালে নির্বাচন কমিশন গঠনের জন্য গঠিত সার্চ কমিটিতেও তার নাম ছিল।
বর্তমানে তিনি সোনালী ব্যাংকের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন যেখানে তার নিয়োগের পেছনে চট্টগ্রামের প্রভাব থাকার কথা বলা হচ্ছে। অর্থসচিব থাকাকালে বিশ্বব্যাংকের একটি প্রকল্পে পরামর্শক হিসেবে কাজ করেছিলেন আহসান এইচ মনসুরের প্রতিষ্ঠান পিআরআই যা তার বর্তমান প্রভাব বৃদ্ধির অন্যতম কারণ বলে মনে করা হয়।
মুসলিম চৌধুরীর ভাই মহসিন চৌধুরী ২০২৪ সালের ৮ মে বিএসইসির কমিশনার পদে নিয়োগ পান। আগস্ট বিপ্লবের পর বিএসইসি চেয়ারম্যান পদ থেকে অধ্যাপক শিবলী রুবাইয়াত পদত্যাগ করলে, মহসিন চৌধুরীকে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান করা হয়। যদিও আগের সরকারের আমলে নিয়োগপ্রাপ্ত প্রায় সব কর্মকর্তাই সরিয়ে দেওয়া হয়েছে কিন্তু তিনি এখনো বহাল আছেন।
আইডিআরএ চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ পাওয়া এম আসলাম আলমও অর্থ মন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিব ছিলেন। ২০১৬ সালে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির ঘটনার সময় তিনি সচিবের দায়িত্বে ছিলেন। যদিও এ ঘটনার তথ্য গোপন রাখা হয়েছিল পরবর্তীতে তাকে অন্য পদে সরিয়ে দেওয়া হয় এবং পরবর্তীতে তিনি আইডিআরএ চেয়ারম্যান হিসেবে ফিরে আসেন।
এছাড়া সাধারণ বীমা করপোরেশনের চেয়ারম্যান হিসেবে নিযুক্ত হয়েছেন মোহাম্মদ জয়নুল বারী, যিনি ২০২২ সালে আইডিআরএ চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেছিলেন। তিনি আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা এইচটি ইমামের ঘনিষ্ঠ আত্মীয় বলেও জানা যায়।
বিশ্বব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, “আমলারা মূলত প্রশাসনিক কাঠামোর ভেতরেই কাজ করেন। অতীতে তারা যে সরকারের অধীনে কাজ করেছেন সেটি নিয়ে তাদের দোষী বা নির্দোষ বলা কঠিন। তবে এখন তাদের ভূমিকা কেমন সেটিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।”
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাববিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক আল-আমিন মনে করেন, “বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের যে আকাঙ্ক্ষা তা বাস্তবায়নে প্রশাসনকে ঢেলে সাজাতে হবে। শুধু অভিজ্ঞতার কথা বলে পূর্ববর্তী প্রশাসনকে ধরে রাখার যৌক্তিকতা নেই।”
অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক খাতের গুরুত্বপূর্ণ পদে পূর্ববর্তী সরকারের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিরা এখনো বহাল থাকায় নতুন পরিবর্তনের প্রতিফলন কতটা কার্যকর হবে তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। রাজনৈতিক পটপরিবর্তন হলেও বাস্তবে প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক কাঠামোয় কতটা পরিবর্তন এসেছে সেটিই এখন দেখার বিষয়।

