বগুড়ার পুলিশ লাইনসের ইন-সার্ভিস সেন্টার, একটি ভয়াবহ গোপন কারাগার। যা দেশের অন্ধকার দিকগুলোর অন্যতম। এখানে নিরীহ নারী ও পুরুষদের ধরে নিয়ে অত্যাচার করা হতো, যাতে তাদেরকে ‘জঙ্গি’ বানানো যায়। এটি শুধুমাত্র একটি গোপন কারাগার ছিল না বরং এটি একটি ভয়াবহ তৎপরতা যা দেশের বিভিন্ন স্থানে ঘটানো জঙ্গি নাটকের পেছনে ব্যবহৃত হতো। যেমন কল্যাণপুরের জাহাজবাড়ি, পান্থপথে হোটেল ওলিওতে আত্মঘাতী বিস্ফোরণ, এবং গাজীপুরের পাতারটেক অভিযান—এ সমস্ত ঘটনায় নিহত বা গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিরা বেশিরভাগ সময় এই গোপন কারাগারে গুম হয়ে থাকতেন।
এখানে গ্রামাঞ্চলের চাষি, শ্রমিক, গ্রাম চিকিৎসকসহ সাধারণ মানুষের ওপর অত্যাচার চালানো হতো। তাদেরকে ধরে এনে মিথ্যা স্বীকারোক্তি আদায় করার জন্য চলত এক ভয়াবহ নির্যাতনের প্রক্রিয়া। কাউকে ক্রসফায়ারের নামে হত্যা করা হতো এবং অন্যদেরকে মামলায় ফাঁসিয়ে দেওয়া হতো।
গোপন কারাগারের নির্মম শিকার ছিলেন অনেক নারী, তাদের সঙ্গে ছিল শাবক শিশু। পুরুষদের ধরতে নারীদের গুম করার এক জঘন্য কৌশল ব্যবহার করা হতো। এই নৃশংস কর্মকাণ্ডের মূল হোতা ছিলেন বগুড়ার এএসপি আরিফুর রহমান মণ্ডল। যিনি পরবর্তীতে সিরাজগঞ্জের পুলিশ সুপার হন। তিনি এবং তার সহকারীরা শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের মাধ্যমে এসব নারীদের ভয়ের মধ্যে রেখেছিলেন। এসব নির্যাতনের মধ্যে নারী ও শিশুর শ্লীলতাহানির হুমকি, ধর্ষণের ভয় এবং ক্রসফায়ারের ভয় ছিল।
এই নির্যাতনকে কেন্দ্র করে বগুড়ার পুলিশ লাইনসের গোপন কারাগারে বন্দি করা নারীদের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেছেন কয়েকজন নারী। এসব নারী জানান, তাদেরকে রাতে ডেকে নিয়ে নির্জন কক্ষে বেধড়ক মারধর করা হতো এবং কোনো নারী পুলিশ তাদের পাশে রাখা হতো না। অন্তঃসত্ত্বা নারীও এই নির্যাতন থেকে বাদ পড়েননি। এমনকি তাদেরকে প্রমাণ করতে বাধ্য করা হতো যে তারা কতটা ক্ষতিগ্রস্ত।
২০১৬ সালে তিন গৃহবধূ—সাজেদা আক্তার সাথী, রোজিনা বেগম ও জান্নাতি আক্তার জেমি—নিজ নিজ বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে গিয়ে বগুড়ার গোপন কারাগারে আটকে রাখা হয়েছিল। তাদের সঙ্গে ছিল তিনটি শিশু৷ এর মধ্যে একজন ছিল দুগ্ধপোষ্য। এখানে বন্দি অবস্থায় তাদের ওপর চলে অমানবিক নির্যাতন। তাদের স্বামীদের খোঁজে তাদেরকে প্রতিদিন গভীর রাতে ডেকে নিয়ে মারধর করা হতো।
এই নারীদের মধ্যে জান্নাতি আক্তারের স্বামী আবু সাইদ জানান, তার স্ত্রী এবং সন্তানকে বগুড়া ডিবি অফিসে গুম করা হয়েছিল এবং তাদের ওপর চলত অত্যাচার। তাঁর স্ত্রীকে দুধ খাওয়ার সময় তাকে চুপ থাকতে বলা হতো এবং কখনো কখনো তার শ্লীলতাহানির হুমকি দেওয়া হতো। সাজেদার স্বামী নজরুল ইসলাম ও রোজিনার স্বামীও এই গোপন কারাগারে বন্দি ছিলেন। পরে তাদেরকে ক্রসফায়ারের নামে হত্যা করা হয়।
২০১৯ সালে রাশিদা খাতুনের মতো আরও অনেকেই গুমের শিকার হন। রাশিদা তার পরিবারের সদস্যদের জানাতে সক্ষম হয়েছিলেন যে তাকে বগুড়ার গোপন কারাগারে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের মুখে ফেলানো হয়েছিল।
বগুড়ার পুলিশ লাইনসের ইন-সার্ভিস সেন্টারের এই গোপন কারাগার ছিল আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ক্ষমতার অপব্যবহারের এক ভয়াবহ প্রমাণ। এটি নাগরিকদের মৌলিক মানবাধিকারের লঙ্ঘন এবং রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের একটি রূপ। অভিযুক্তরা অনেকেই এখনো মুক্ত রয়েছে, আর তাদের মধ্যে কয়েকজন বর্তমানে গুরুত্বপূর্ণ পদে রয়েছেন।
এর মধ্যে আরিফুর রহমান মণ্ডল, যিনি এই ঘৃণ্য কার্যক্রমের মূল হোতা ছিলেন। পরবর্তী সময়ে পুলিশ বাহিনীতে পদোন্নতি পেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে নিযুক্ত হন। ২০১৭ থেকে ২০২০ পর্যন্ত তিনি একাধিক পুরস্কারে ভূষিত হন এবং এটি দেশের বিচারহীনতার বাস্তবতা তুলে ধরে। এই পরিস্থিতি প্রমাণ করে যে, অপরাধীদের শাস্তির আওতায় না আনা হলে তারা আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে।
গোপন কারাগারের এই ঘটনার তদন্ত এখনও চলছে এবং অভিযুক্তদের বিচার প্রক্রিয়া চলছে। এটি রাষ্ট্রীয় স্তরে গুম এবং নির্যাতনের ভয়াবহ এক চিত্র তুলে ধরে। যা দেশের শীর্ষ নেতৃবৃন্দের সাথে একটি সুপরিকল্পিত কাঠামো হিসাবে যোগসূত্রিত।

