ঢাকার মহাখালী বাস টার্মিনাল। সকাল ১০টা বাজতে না বাজতেই ঈদ উপলক্ষে দেশের বিভিন্ন গন্তব্যের উদ্দেশ্যে ছেড়ে যাচ্ছে একের পর এক দূরপাল্লার বাস। তবে টার্মিনাল থেকে বের হওয়ার আগে প্রতিটি বাসকে গুনতে হচ্ছে ৫২০ টাকা চাঁদা।
একজন বাসচালক জানান, ‘গেট পাস না দিলে বাস বের করতে পারবো না। যাত্রী থাকুক বা না থাকুক আমাদের এই টাকা দিতেই হবে।’ এই চাঁদার টাকা আদায়কারী এক ব্যক্তি বলেন, ‘এটাই এখানকার নিয়ম। মালিক সমিতির নির্দেশেই এই টাকা তোলা হয়।’
গবেষণায় উঠে এসেছে, ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর পরিবহন খাতে নেতৃত্ব বদল হলেও চাঁদাবাজির চিত্র অপরিবর্তিত রয়েছে। বিভিন্ন পরিবহন সংগঠন, রাজনৈতিক নেতা এবং স্থানীয় প্রভাবশালীদের ছত্রচ্ছায়ায় এখনও প্রতিদিন কোটি কোটি টাকা আদায় করা হচ্ছে।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘এই চাঁদাবাজির ফলে পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি পাচ্ছে যার প্রভাব সাধারণ যাত্রীদের ওপর পড়ছে।’
পরিবহন খাতের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে রাজনৈতিক পালাবদলের বিষয়টিও স্পষ্ট হয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকারের সময় পরিবহন খাত নিয়ন্ত্রণ করতো দলটির ঘনিষ্ঠ নেতাদের একটি সিন্ডিকেট। কিন্তু সরকার পরিবর্তনের পর সেই নিয়ন্ত্রণ এখন বিএনপিপন্থী মালিক ও শ্রমিক নেতাদের হাতে চলে গেছে।
নতুন নেতৃত্ব চাঁদাবাজির অভিযোগ অস্বীকার করে বলছে, সংগঠনের খরচ চালানোর জন্যই তারা এই অর্থ সংগ্রহ করছে। তবে সরেজমিনে দেখা গেছে, মালিক-শ্রমিক সংগঠন ছাড়াও স্থানীয় প্রভাবশালী ও রাজনৈতিক নেতাদের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণেই এই চাঁদাবাজি চলছে।
সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, পরিবহন খাতে চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণে পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। সড়ক পরিবহন ও সেতু উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফওজুল কবির খান বলেন, ‘আমরা পুলিশ ও বিআরটিএকে কঠোর হওয়ার নির্দেশ দিয়েছি।’ চাঁদাবাজির দায়ে প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট মালিকদের লাইসেন্স বাতিল করার হুঁশিয়ারিও দেন তিনি।
পরিবহন চাঁদাবাজির ধরন বহুমুখী। ঢাকার মহাখালী, গাবতলী ও সায়েদাবাদ টার্মিনালে প্রবেশ ও বের হওয়ার সময় গাড়িগুলোকে মোটা অঙ্কের চাঁদা দিতে হয়। শ্রমিক কল্যাণ, কমিউনিটি পুলিশ, মসজিদ এবং বিভিন্ন সংগঠনের নামে চাঁদা আদায় করা হয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে টোকেন ও স্টিকার ব্যবহারের মাধ্যমে অর্থ নেওয়া হলেও অনেক সময় রশিদ ছাড়াই টাকা আদায় করা হয়।
টিআইবির গবেষণা অনুযায়ী, বছরে প্রায় এক হাজার ৫৯ কোটি টাকা শুধুমাত্র বাস ও মিনিবাস থেকে চাঁদা আদায় হয়। গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ঢাকা শহরের বিভিন্ন পরিবহন স্ট্যান্ড থেকে প্রতিদিন গড়ে দুই কোটি ২১ লাখ টাকা চাঁদাবাজি হয়।
পরিবহন খাতে চাঁদাবাজির সঙ্গে বিভিন্ন পর্যায়ের রাজনৈতিক নেতা, সংগঠনের কর্মকর্তা, বিআরটিএ এবং স্থানীয় প্রশাসনের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে পুলিশের অংশগ্রহণ কমে গেছে বলে গোয়েন্দা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। বর্তমানে এই চাঁদার টাকা মূলত পরিবহন মালিক-শ্রমিক সংগঠন, স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি এবং রাজনৈতিক নেতাদের মধ্যে ভাগ হচ্ছে।
চাঁদাবাজির শিকার সাধারণ পরিবহন শ্রমিকরা বলছেন, ‘আগে আওয়ামী লীগ খেত এখন বিএনপি খাচ্ছে।’ টার্মিনাল থেকে শুরু করে জেলা পর্যায়ে পৌঁছানো পর্যন্ত চাঁদার টাকা দিতে হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই চাঁদাবাজি বন্ধ না হলে পরিবহন সেক্টরে শৃঙ্খলা ফেরানো কঠিন হবে। যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে এবং এই অনিয়মের মূল কারণগুলো চিহ্নিত করে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।

