গত ২০ মার্চ ঢাকা ক্লাবে ইফতার করার পর শাহবাগ মেট্রোরেল স্টেশন থেকে উত্তরার উদ্দেশে যাত্রা করেছিলেন কবির হোসেন (ছদ্মনাম)। সন্ধ্যা সাতটা পাঁচ মিনিটে তিনি মেট্রোতে উঠেন এবং বাসায় পৌঁছে তারাবির নামাজ পড়ার পরিকল্পনা ছিল। তবে মেট্রোর ভেতরে প্রচণ্ড ভিড় ছিল এবং কেউ নিয়মকানুনের তোয়াক্কা করছিল না। কোনো রকমে মেট্রোতে উঠে তিনি যাত্রা করেন কিন্তু যখন মেট্রোরেল উত্তরায় পৌঁছায় তখন পকেটে হাত দিয়ে দেখেন তার টাকা চুরি হয়ে গেছে। মোটা অঙ্কের টাকা হারিয়ে তিনি হতাশ হন কিন্তু সিসিটিভি ক্যামেরা থাকার পরেও তার পাশে কেউ সহযোগিতা করার জন্য এগিয়ে আসেনি।
কেবল কবির হোসেনই নন, মেট্রোরেলে নিয়মিত চুরির ঘটনা ঘটছে। বিশেষত ফর্মাল পোশাকে অফিসফেরত বা অফিসগামী ছদ্মবেশে এক চোরচক্র ভিড় সৃষ্টি করে চুরির সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে। বিশেষত যেসব স্টেশনে বেশি ভিড় হয় সেইসব স্টেশনগুলোকে টার্গেট করে এ চক্র। টিকিট কাটার দীর্ঘ লাইনে বা ট্রেনের জন্য অপেক্ষমাণ যাত্রীদের ভিড়ে ট্রেন এলে ওঠানামার সময় চুরির ঘটনা ঘটে। এই পরিস্থিতিতে যাত্রীদের পক্ষে চোরকে চিহ্নিত করা প্রায় অসম্ভব।
মেট্রোরেলে নিরাপত্তার দায়িত্বে রয়েছে ঢাকা মাস র্যাপিড ট্রানজিট পুলিশ (এমআরটি পুলিশ), আনসার এবং মেট্রো কর্তৃপক্ষ। প্রতিটি স্টেশনে সিসিটিভি ক্যামেরা রয়েছে কিন্তু চুরির ঘটনার পরও কার্যকর নিরাপত্তা ব্যবস্থা দেখা যায় না।
এমআরটি পুলিশের প্রধান সিদ্দিকী তানজিলুর রহমান জানান, এমআরটি পুলিশ মেট্রোরেলের সার্বিক নিরাপত্তার দায়িত্বে রয়েছে। তবে, মেট্রোর ভেতরে চুরি ঘটলে চোরকে ধরার দায়িত্ব তাদের নয়। এমনকি সিসিটিভি ফুটেজও পাওয়ার ক্ষেত্রে সহযোগিতা করে না মেট্রো কর্তৃপক্ষ যার ফলে ঘটনার সমাধান সম্ভব হয় না।
ফেসবুকে একটি ভিডিওতে দেখা যায়, ২৬ ফেব্রুয়ারি কাজীপাড়া স্টেশনে এক ব্যক্তি সাদা শার্ট ও কালো প্যান্ট পরিহিত অবস্থায় আইফোন ১৫ চুরি করছেন। ভিডিওটির ক্যাপশনে লেখা হয়, “দেখতে ভদ্রলোক তবে আইফোন চুরি করেছেন”। এছাড়াও সেখানকার যাত্রীদের সাবধান করা হয় অতিরিক্ত ভিড়ে তাদের মোবাইল, মানিব্যাগ ও অন্যান্য মূল্যবান সামগ্রী নিরাপদ স্থানে রাখতে। ইফতার আগ মুহূর্তে যাত্রীদের ভিড় মেট্রো স্টেশনে অনেক বেড়ে যায় এবং ওই সময়টিতেই চোরচক্র সক্রিয় হয়ে ওঠে। ঈদ কেন্দ্রিকও মেট্রো স্টেশনগুলোতে ভিড় বাড়ে তখন চোরচক্রের গতিবিধি আরও ত্বরান্বিত হয়।
মেট্রোরেলের নিরাপত্তার জন্য যাত্রীদের হ্যান্ড মেটাল ডিটেক্টর দিয়ে তল্লাশি, স্টেশনের প্রবেশমুখে আর্চওয়ের ব্যবস্থা এবং যাত্রীদের লাগেজ স্ক্যানিং-এর জন্য মেট্রো স্টেশনে যন্ত্রপাতি থাকার কথা কিন্তু বর্তমানে সেগুলো দেখা যায় না।
মেট্রোরেলের উপ-মহাব্যবস্থাপক (নিরাপত্তা) মেজর মোহাম্মাদ জাকির সিদ্দিকী জানান, এই যন্ত্রাংশগুলো ব্যয়বহুল তবে কিছু স্থানে এগুলোর ব্যবহার রয়েছে এবং তিনি মন্ত্রণালয়ে আরো যন্ত্রপাতি পাওয়ার জন্য আবেদন করেছেন।
এমআরটি পুলিশ গত এক সপ্তাহে দুজন পকেটমারকে আটক করেছে। ১১ মার্চ ফার্মগেট স্টেশন থেকে এক পকেটমারকে আটক করা হয়, যিনি এক যাত্রীর ব্যাগ থেকে মোবাইল চুরি করেছিলেন। গত ১০ মার্চ কারওয়ান বাজার স্টেশন থেকেও আরেক পকেটমারকে আটক করা হয়। এর আগেই ৬ মার্চ মতিঝিল মেট্রো স্টেশনে প্রায় ২২ লাখ টাকা চুরির অভিযোগ ওঠে। ওই সময় ভুক্তভোগী মেজবাহ উদ্দিন থানায় একটি অভিযোগ করেন।
এ ধরনের ঘটনার পর মেট্রো কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে যে, তারা স্টেশনগুলোতে নজরদারি বাড়িয়েছে। তবে অতিরিক্ত ভিড় থাকায় চুরি ঠেকানো যাচ্ছে না। তারা যাত্রীদের সতর্ক থাকতে অনুরোধ করেছে।

