রাজশাহীভিত্তিক বৃহৎ আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান নাবিল গ্রুপের নামে ও বেনামে ইসলামী ব্যাংক থেকে বিপুল পরিমাণ ঋণ নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। ব্যাংকের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, নাবিল গ্রুপের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে নিয়ন্ত্রণাধীন ১৪ কর্মী ও সুবিধাভোগীদের নামে গঠিত ৯টি কোম্পানির মাধ্যমে ব্যাংকটি ৯ হাজার ৫৬৫ কোটি টাকা ঋণ দিয়েছে।
নাবিল গ্রুপের কর্মী নজরুল ইসলাম ও নাজমুল হাসান যথাক্রমে ৪১ হাজার ২০ এবং ২৯ হাজার ৫৩৮ টাকা বেতন পান। অথচ এই দুই কর্মী আনোয়ার ফিড মিলস নামে একটি কোম্পানির মালিক যা ইসলামী ব্যাংক থেকে ১ হাজার ৩৩৯ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে। একইভাবে গ্রুপটির কর্মচারী শাকিল হোসেন ও রায়হানুল ইসলামের মালিকানাধীন নাবিল গ্রেইন ক্রপস কোম্পানিকে ১ হাজার ৭৭ কোটি টাকা ঋণ দেওয়া হয়েছে। যদিও এই কোম্পানির নাম নাবিল গ্রুপের ওয়েবসাইটে নেই। তবে ব্যাংক কর্মকর্তারা নিশ্চিত করেছেন প্রকৃত সুবিধাভোগী নাবিল গ্রুপই।
ইসলামী ব্যাংকে নাবিল গ্রুপের নামে ও বেনামে মোট ঋণের পরিমাণ ১৩ হাজার ৬৪৫ কোটি টাকা, যার অধিকাংশই নেওয়া হয়েছে আওয়ামী লীগ সরকারের সময় বিশেষত ২০২২ সালে। যদিও এসব ঋণ এখনো খেলাপি হয়নি তবে ঋণের অর্থ আদায়ে তেমন কোনো কার্যকর উদ্যোগও দেখা যায়নি।
নাবিল গ্রুপের চেয়ারম্যান আমিনুল ইসলাম স্বপন সম্প্রতি জামায়াতে ইসলামীর রাজশাহী সম্মেলনের মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন, যা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা সৃষ্টি হয়েছে। তবে রাজশাহী মহানগর জামায়াতের আমির কেরামত আলী দাবি করেন, আমিনুল স্বপন তার অজ্ঞাতসারে মঞ্চে উঠেছিলেন।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পরিবার এবং ১০টি ব্যবসায়ী গ্রুপের বিরুদ্ধে ব্যাংক জালিয়াতি ও অর্থ পাচারের অভিযোগ তদন্তে ১১টি কমিটি গঠন করা হয় যেখানে নাবিল গ্রুপের নামও অন্তর্ভুক্ত।
বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) গত সেপ্টেম্বর মাসে নাবিল গ্রুপের এমডি আমিনুল ইসলাম, তার স্ত্রী ইসরাত জাহান, বাবা গ্রুপের চেয়ারম্যান জাহান বক্স মণ্ডল, মা আনোয়ারা বেগম এবং দুই সন্তান এজাজ আবরার ও আফরা ইবনাথের ব্যক্তিগত ব্যাংক হিসাব জব্দ করেছে। তবে কোম্পানির ব্যাংক হিসাব পরিচালনায় কোনো বাধা নেই।
ইসলামী ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ নথি অনুসারে, নাবিল গ্রুপের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ঋণসীমা ৮ হাজার ১১২ কোটি টাকা হলেও, ২০ মার্চ পর্যন্ত ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ৯ হাজার ৫৬৫ কোটি টাকা। এছাড়া ২০২২ সালের মার্চ পর্যন্ত ইসলামী ব্যাংকের রাজশাহী শাখায় নাবিল গ্রুপের ঋণ ছিল ২ হাজার ৪০০ কোটি টাকা যা বছর শেষে বেড়ে দাঁড়ায় ৯ হাজার ৫৪৭ কোটিতে।
ব্যাংক কোম্পানি আইন অনুযায়ী, কোনো ব্যাংক তার মূলধনের সর্বোচ্চ ২৫ শতাংশ একক গ্রাহক বা গ্রুপকে ঋণ দিতে পারে, যার মধ্যে সরাসরি ঋণের সীমা ১৫ শতাংশ। ইসলামী ব্যাংক বর্তমানে মূলধন ঘাটতিতে থাকলেও তারা নাবিল গ্রুপকে নির্ধারিত সীমার পাঁচ গুণের বেশি ঋণ দিয়েছে।
এ বিষয়ে নাবিল গ্রুপের চেয়ারম্যান আমিনুল ইসলাম স্বপন বলেন, ‘একটি পিওনের নামে চাইলেই কি কেউ ঋণ নিতে পারে? ঋণ নেওয়ার জন্য অনেক ধাপ পেরোতে হয়। ইসলামী ব্যাংক কেন তাদের নামে ঋণ দিল সেই ব্যাখ্যা ব্যাংককেই দিতে হবে।’ তবে বেনামি কোম্পানিগুলোর ঋণের প্রকৃত সুবিধাভোগী তিনি নন বলেও দাবি করেন তিনি।
ইসলামী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে চাননি। তবে তার হোয়াটসঅ্যাপে পাঠানো প্রশ্নের জবাবে তিনি লেখেন, ‘টোটালি ফলস’ অর্থাৎ সম্পূর্ণ মিথ্যা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান জানিয়েছেন, যে কয়েকটি ব্যাংকের ফরেনসিক অডিট করা হচ্ছে তার মধ্যে ইসলামী ব্যাংকও রয়েছে। নাবিল গ্রুপসহ সব অনিয়ম তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বিশেষজ্ঞ ব্যাংকার মোহাম্মদ নূরুল আমিন বলেন, এসব ঋণ অনুমোদনের প্রক্রিয়া পূর্বনির্ধারিত ছিল এবং এতে ব্যাংকের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তারা জড়িত থাকতে পারেন। এ ছাড়া কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দায়িত্বশীলতাও প্রশ্নবিদ্ধ।
নাবিল গ্রুপের ঋণ বিতর্ক ব্যাংক খাতের সুশাসন নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। বিষয়টি নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কী ব্যবস্থা নেয় তা এখন দেখার বিষয়।

