মেহেরপুরে ক্যাসিনো ব্যবসা কোনোভাবেই থামানো যাচ্ছে না। অভিযোগ উঠেছে, পুলিশের সহায়তায় এই অপরাধ ছড়িয়ে পড়ছে। এর আগে মেহেরপুরভিত্তিক অনলাইন জুয়ার নেটওয়ার্ক নিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে একাধিক প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। তারপরও দোষীরা ধরাছোঁয়ার বাইরে।
বিএনপি নেতা ও মেহেরপুর জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট মারুফ আহমেদ বিজন বলেন, মেহেরপুর এখন অনলাইন জুয়ার রাজধানী হিসেবে পরিচিত। এটি লজ্জাজনক। এখন পর্যন্ত অভিযুক্ত কেউই গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনের প্রতিবাদ করেনি বা আইনের আশ্রয় নেয়নি। এর মানে প্রকাশিত তথ্য সঠিক।
তিনি আরও বলেন, সাবেক জনপ্রশাসন মন্ত্রী ফরহাদ হোসেনের স্ত্রী সৈয়দা মোনালিসা অনলাইন জুয়ার অন্যতম পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। মোনালিসার দেবর মৃদুল নিজেই বলেছেন, তার ভাবি অনলাইন জুয়ার মাধ্যমে হাজার কোটি টাকার মালিক হয়েছেন। পুলিশ মোনালিসাকে গ্রেপ্তার করেছে কিন্তু কোনো অনলাইন জুয়ার মামলায় তার নাম দেওয়া হয়নি।
সম্প্রতি একটি ভিডিওতে দেখা যায়, শেখ শাহরিয়ার আহমেদ নামে এক ব্যক্তি জাতীয় পরিচয়পত্র হাতে নিয়ে তার লক হয়ে যাওয়া অনলাইন ক্যাসিনো এজেন্ট চ্যানেলের অ্যাকাউন্টের টাকা ছাড়ের জন্য আবেদন করছেন। তিনি মেহেরপুর জেলা বিএনপির সাবেক কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক ও বর্তমান আহ্বায়ক কমিটির সদস্য মোছা. রোমানা আহমেদের ছেলে।
আরেকটি স্ক্রিনশটে দেখা যায়, ‘মরফি মেইন’ নামক ক্যাসিনো এজেন্ট চ্যানেলে ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে রাশিয়ায় পাচার করা ১ কোটি ২২ লাখ টাকা জমা রয়েছে।
দৈনিক কালবেলা এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, মেহেরপুরের কিছু অনলাইন ক্যাসিনো এজেন্ট কিছুদিন গা ঢাকা দিলেও আবার ফিরে এসে সক্রিয় হয়েছে। কেউ কেউ রাজনৈতিক সমাবেশে অংশ নিচ্ছে। আবার কেউ সমাবেশে লোক সরবরাহ করছে। কিছু এজেন্ট অন্য জেলা থেকে ব্যবসা চালাচ্ছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পুলিশের কয়েকজন কর্মকর্তা জানান, কালবেলার প্রতিবেদনের পর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পুলিশ সদর দপ্তর থেকে কিছু এজেন্ট ও তাদের সম্পদের তথ্য চাওয়া হয়। এসব তথ্য অফিসিয়ালি পাঠানো হয়েছে।
ফলোআপ প্রতিবেদনে জানা যায়, পাঁচটি এজেন্ট অ্যাকাউন্ট রাশিয়া থেকে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এতে তিনজন এজেন্টের সাড়ে পাঁচ কোটি টাকা আটকে গেছে। এছাড়া আরও ২৩টি অ্যাকাউন্টের স্ক্রিনশটে দেখা যায়, প্রতিটি অ্যাকাউন্টে এক কোটি টাকার বেশি জমা রয়েছে।
উল্লেখযোগ্য অ্যাকাউন্টগুলোর মধ্যে রয়েছে—মরফি মেইন, আরিয়া মেইন, ভেনম মেইন, সাইবর্গ মেইন, নাটান মেইন, পাওয়ার মেইন, রোজ মেইন, জনি মেইন, নবাব মেইন, জলি মেইন, হাজবি মেইন ও লেনিয়া। এছাড়া, নগদের কয়েকটি মার্চেন্ট ও পেমেন্ট সিম নম্বর পাওয়া গেছে। যেগুলো অনলাইন জুয়ার অর্থ লেনদেনে ব্যবহৃত হয়।
মেহেরপুরের পুলিশ সুপার মাকসুদা আক্তার খানাম বলেন, ‘প্রকাশিত সংবাদটি জেলা পুলিশের নজরে এসেছে। আমরা গুরুত্ব সহকারে বিষয়টি দেখছি। প্রতিবেদনে উল্লিখিত এজেন্টরা এখন এলাকায় নেই। তবে তাদের গতিবিধির ওপর নজর রাখা হচ্ছে।’
তিনি জানান, অনলাইন জুয়ার ব্যাপকতা ঠেকাতে থানা পুলিশ ও সাইবার ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন সেল কাজ করছে। ইতোমধ্যে মেহেরপুরে অনলাইন জুয়ার এজেন্টদের বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ও সাইবার নিরাপত্তা আইনে ১০টি মামলা হয়েছে। বিভিন্ন মামলায় ৫৭ জনকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
পুলিশ সুপার আরও বলেন, ২০১৮ সালের ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে অনলাইন জুয়ার অপরাধীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ ছিল। কিন্তু ২০২৩ সালে প্রণীত সাইবার নিরাপত্তা আইনে এই ধারাটি অধর্তব্য করা হয়। ফলে এখন সরাসরি মামলা নেওয়া বা গ্রেপ্তার করা সম্ভব নয়। তবে অন্য উপায়ে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্তদের অভিযোগ গ্রহণ করে আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।

