টাঙ্গাইলের ঘাটাইল উপজেলার নলমা পূর্বপাড়ার বাসিন্দা লুৎফর রহমান তার পরিবার নিয়ে পৈতৃক ভিটায় বসবাস করছেন। জীবিকার জন্য রয়েছে একটি ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা যেটি নিজ বাড়ির বৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ ব্যবহার করে চার্জ দেন তিনি। তবে এ বিষয়টিই তার পরিবারের জন্য এখন গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সম্প্রতি ঘাটাইল বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) ক্রয় ও বিতরণ বিভাগের উপ-সহকারী প্রকৌশলী শাহাদত হোসেন ওই বাড়িতে গিয়ে পরিবারের সদস্যদের বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়ার হুমকি দেন এবং ভয়ভীতি দেখিয়ে আদায় করেন নগদ টাকা। অভিযোগ অনুযায়ী, তিনি প্রথমে নগদ পাঁচ হাজার টাকা নিয়ে যান এবং পরে আরো দেড় হাজার টাকা পাঠাতে নিজের বিকাশ নম্বর দিয়ে যান।
লুৎফর রহমানের স্ত্রী আবেগঘন কণ্ঠে বলেন, “হায় হায় গো, আমার কাছ থেকে কীভাবে টাকা নিল! পাঁচ হাজার নিছে আবার বলছে দেড় হাজার পাঠাইতে। বিকাশ নাম্বার দিয়া গেছে। ওই নাম্বার থিকা ফোনও দিছে একদিন। আমরা গরিব মানুষ বৈধভাবে মিটার এনে বিদ্যুৎ নিয়েছি। একটা অটো আছে ওইটা চার্জ দেই। এই কারণেই আমাগো বাড়ি আইসা ধোঁকা দিয়া টাকাগুলা নিয়া গেল।”
এই ঘটনার সময় সেখানে উপস্থিত হন একই গ্রামের ষাটোর্ধ্ব এক নারী প্রতিবেশী। তিনি জানান, “আমাগো কাছ থাইকাও চার হাজার টাকা নিছে। এক হাজার টাকার চারটা নোট দিছি।”
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, বিদ্যুৎ সংযোগ কেটে দেওয়া ও মামলা দিয়ে ফাঁসানোর ভয় দেখিয়ে শাহাদত হোসেন এই অর্থ আদায় করেছেন। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, মাত্র দেড় মাস আগে ঘাটাইলে যোগদান করেন শাহাদত হোসেন। যোগদানের পরপরই তিনি বহিরাগতদের নিয়ে একটি সিন্ডিকেট গড়ে তুলে ঘুষ বাণিজ্যে জড়িয়ে পড়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। যুগান্তরের অনুসন্ধানে এসব অভিযোগের সত্যতার প্রমাণও মিলেছে।
একই এলাকার বাসিন্দা ষাটোর্ধ্ব নারীটির ছেলে হাসেন আলী বলেন, “টাকা না নিয়া সে কোনোভাবেই যাইলো না।” তিনি নিজের বাড়ির সামনে থাকা একটি ট্রান্সফরমার দেখিয়ে বলেন, “লাইন টানানোর সময় এক লাখ ৫৫ হাজার টাকা দিয়া এই ট্রান্সফরমারটা এনেছি।”
পাড়া কুশারিয়া গ্রামের এক নারী বলেন, “আমাদের কাছ থেকেও সাড়ে চার হাজার টাকা নিছে।” কারণ জানতে চাইলে জানান, “না দিলে মামলা দেবে এই কইয়া ভয় দেখায়।”
এই গ্রামের আলমগীরও জানান, “আমরা বৈধভাবে মিটার বসিয়ে বিদ্যুতের বিল দেই। তারপরও ধোঁকা দিয়া আমাদের দুইটা ঘর থাইকা সাড়ে চার হাজার টাকা নিছে। গ্রামের সহিদ খানের কাছ থেকে দুই হাজার সোহেল মিয়ার কাছ থেকে পাঁচ শ’ টাকা নিছে।”
সত্তুরবাড়ি গ্রামের মধু খাঁর ছেলে ইয়াছিন বলেন, “আমার একটা ছোট খামার আছে। প্রতি মাসে যে পরিমাণ ইউনিট খরচ করি, সেই অনুযায়ী বিল নেওয়ার কথা। কিন্তু অফিস থেকে বিল করে ৩০০ ইউনিটের। মিটার থাকার পরও বেশি বিল দিতেছি। দুই বছর ধরে এইভাবে বিল দিতেছি। হঠাৎ সেদিন নতুন এক ইঞ্জিনিয়ার আইসা বলে, লাইন কাইটা দিমু। আমার কাছে সাড়ে সাত হাজার টাকা চায়। পরে আমি দেড় হাজার দেই।”
এছাড়া বগুড়া থেকে আসা রাশেদ নামের এক ব্যক্তি ঘাটাইলের বেলুয়াটিকি এলাকায় একটি পোলট্রি খামার গড়েছেন। সরেজমিনে তাকে না পাওয়া গেলেও খামারের কর্মী সুজন জানান, “টাকা ছাড়া কি গেছে! তবে কত নিছে জানি না।” পরে মালিক রাশেদ মিয়ার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তিনি ফোনে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
বেলুয়াটিকি গ্রামের এক ব্যক্তি নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “আমার কাছ থেকে ১০ হাজার টাকা নিছে।”
ঘুষের অভিযোগ নিয়ে শাহাদত হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে প্রথমে তিনি ফোন কেটে দেন। এরপর একাধিকবার কল করেও তাকে পাওয়া যায়নি। অবশেষে বৃহস্পতিবার বেলা পৌনে ২টার দিকে ঘাটাইল বিদ্যুৎ অফিসে গিয়ে সরাসরি প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, “আমার সময় নেই,” বলে চেয়ার ছেড়ে তড়িঘড়ি করে বের হয়ে যান।
ভুক্তভোগীদের দাবি, এই অবৈধ অর্থ আদায়ের ঘটনায় দ্রুত তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হোক। ঘুষ, ভয়ভীতি ও দুর্নীতির মতো ঘটনাগুলোর বিরুদ্ধে প্রশাসনের কঠোর অবস্থান নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

