দেশের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে বিপুল অঙ্কের অর্থ আত্মসাৎ, বিদেশে পাচার এবং সন্দেহজনক লেনদেনের অভিযোগে জড়িয়ে পড়েছেন মিডল্যান্ড ব্যাংকের সাবেক পরিচালক মোহাম্মদ ইসা বাদশা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশে সম্প্রতি তিনি পরিচালক পদ থেকে অপসারিত হন। জানা গেছে, তিনি একাধিক ব্যাংকে নিজের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের নামে ঋণগ্রহণ করে তা খেলাপি করেন। বর্তমানে তিনি কানাডায় অবস্থান করছেন।
বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) এর এক গোপন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, ইসা বাদশা জাহাজ ভাঙা শিল্পের আড়ালে কোটি কোটি টাকা পাচার করেছেন বিদেশে। এই প্রতিবেদন এখন পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) তদন্তাধীন রয়েছে।
বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, মোহাম্মদ ইসা বাদশা এবং তার স্বার্থসংশ্লিষ্ট নামে ২০২৩ সালের মে পর্যন্ত ২৬৩টি আমানত হিসাবে মোট ৬ হাজার ২৯৯ কোটি টাকা জমা ও ৬ হাজার ২৯৩ কোটি টাকা উত্তোলন করা হয়েছে। এসব হিসাবে তখন স্থিতি ছিল মাত্র ৬ কোটি টাকা। এ ছাড়া তার সংশ্লিষ্ট নামে ৬১৬ কোটি টাকার ফান্ডেড ঋণ খেলাপি এবং অবলোপনের আওতায় রয়েছে। তার নামে থাকা ৪ কোটি ৬৩ লাখ টাকার মেয়াদোত্তীর্ণ ব্যাংক গ্যারান্টিরও কোনো হদিস নেই। ফলে কর্তৃপক্ষের ধারণা, তিনি দেশের অর্থ আত্মসাৎ করে বিদেশে পালিয়ে গেছেন। বর্তমানে তার পরিচালিত অন্য সব ঋণ হিসাব বন্ধ রয়েছে। পাশাপাশি পাওয়া গেছে তিনটি ক্রেডিট কার্ড পরিচালনার তথ্য।
ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, ইসা বাদশার সঙ্গে বর্তমানে কোনো যোগাযোগ সম্ভব হচ্ছে না। তিনি কানাডায় অবস্থান করায় সেখানে তার বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করেছে বিএফআইইউ।
বিদেশি তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, মোহাম্মদ ইসা বাদশা, তার স্ত্রী সালমা বাদশা, কন্যা মুমতাহীনা মুন্নু, মুতাফিন মীম, আবু জাফর সিদ্দীক এবং মোহাম্মদ আজান ইসার নামে কানাডার ডেটাবেজে ২০১৪ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে একাধিক সন্দেহজনক লেনদেন (এসটি), বড় অঙ্কের নগদ লেনদেন (এলসিটিআর) এবং ইলেকট্রনিক ফান্ড ট্রান্সফার (ইএফটিআর) রিপোর্ট পাওয়া গেছে। এসব রিপোর্টে দেখা যায়, ২৪ ঘণ্টায় ১০ হাজার কানাডিয়ান ডলারের বেশি লেনদেনের একাধিক রেকর্ড রয়েছে তবে লেনদেনগুলোর উদ্দেশ্য স্পষ্ট নয়।
সিটি ব্যাংক এনএ, মেরিনা ভিউ এশিয়া স্কয়ার সিঙ্গাপুর থেকে মোহাম্মদ ইসা বাদশার নির্দেশে কানাডার দুটি ব্যাংক অ্যাকাউন্টে মোট ৬ লাখ ১৩ হাজার মার্কিন ডলার পাঠানো হয় যার মধ্যে ৩ লাখ ডলার সম্পত্তি ক্রয়ের জন্য ব্যবহার হয়। এ নিয়ে সিঙ্গাপুর কর্তৃপক্ষকে প্রয়োজনীয় তথ্য সরবরাহের অনুরোধ জানায় বিএফআইইউ। সিঙ্গাপুর থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ইসা বাদশা সেখানে আলহাজ মোহাম্মদ বাদশাহ নামে একটি সিটি ব্যাংক অ্যাকাউন্ট পরিচালনা করেন যাতে উল্লেখযোগ্য অঙ্কের লেনদেন হয়েছে।
এছাড়া ইসা বাদশা ও মুমতাহীনা মুন্নুর যৌথ হিসাব থেকে কানাডায় প্রায় ৫৫.৪৮ লাখ কানাডিয়ান ডলারের ৩৮৮টি সন্দেহজনক লেনদেনের তথ্য মিলেছে। মুমতাহীনা মুন্নুর একক ও যৌথ নামে পরিচালিত হিসাবেও বিপুল পরিমাণ লেনদেনের প্রমাণ রয়েছে যার মধ্যে রয়েছে প্রায় ২৫.৭৮ লাখ কানাডিয়ান ডলার এবং ১৫ হাজার মার্কিন ডলারের ৪৫১টি এলসিটিআর বা এসটি। সালমা বাদশার হিসাবেও প্রায় ২.২৭ লাখ কানাডিয়ান ডলারের ১৮টি এসটি এবং ৪.২৩ লাখ কানাডিয়ান ডলারের ৭২টি এলসিটিআর পাওয়া গেছে। সবমিলিয়ে বোঝা যাচ্ছে ইসা বাদশা এবং তার পরিবারের সদস্যরা কানাডায় বড় অঙ্কের লেনদেনের সঙ্গে যুক্ত যার অনেকগুলোকে কানাডা কর্তৃপক্ষ সন্দেহজনক হিসেবে বিবেচনা করেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন ছাড়া দেশের বাইরে বিনিয়োগ বা মূলধন স্থানান্তর আইনত নিষিদ্ধ। ফরেন এক্সচেঞ্জ ইনভেস্টমেন্ট ডিপার্টমেন্ট জানিয়েছে, মোহাম্মদ ইসা বাদশাকে দেশের বাইরে বিনিয়োগের জন্য কোনো অনুমতি দেওয়া হয়নি।
জাহাজ আমদানি ও এলসি বিশ্লেষণে দেখা যায়, যুমা এন্টারপ্রাইজ এবং মুসা অ্যান্ড ইসা ব্রাদার্স নামের প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে ৩১টি এলসির আওতায় জাহাজ ভাঙা যন্ত্রাংশ, ক্যাটারপিলার, ডাম্প ট্রাক, হাইড্রোলিক এক্সকেভেটরসহ বিভিন্ন পণ্য আমদানি করা হয়েছে। এর মধ্যে যুমা এন্টারপ্রাইজ ২০১২ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে ইস্টার্ন ব্যাংকের মাধ্যমে সিলভিয়া শিপ ট্রেড নামের একটি সিঙ্গাপুরভিত্তিক প্রতিষ্ঠান থেকে ৯ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের দুটি এলসিতে যন্ত্রপাতি আমদানি করে। এই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে মুজিবুর রহমান মিলন, যিনি বর্তমানে সিঙ্গাপুরে অবস্থান করছেন এবং দেশের ব্যাংক থেকে নেওয়া ঋণ পরিশোধ না করায় আদালত তাকে দেশে ফেরানোর নির্দেশ দিয়েছে।
যুমা এন্টারপ্রাইজ আরো বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তিতে ১৩ থেকে ৩৫ মিলিয়ন ডলারের এলসির মাধ্যমে স্ক্র্যাপ জাহাজ আমদানি করে। এসব প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে ডানা ইন্টারন্যাশনাল করপোরেশন (অফশোর কোম্পানি, সেইন্ট কিটস ও নেডিসে অবস্থিত), অল সিজ হোল্ডিংস লিমিটেড, ডেমো ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড, রেড রুবি গ্রুপ লিমিটেড, এস শিপ রিসাইক্লিং প্রাইভেট লিমিটেড এবং উরিজেন শিপিং লিমিটেড। এসব কোম্পানির অনেকের অস্তিত্ব বা অবস্থান নিশ্চিত করা যায়নি।
এছাড়া মুসা অ্যান্ড ইসা ব্রাদার্স এক্সিম ব্যাংকের মাধ্যমে ২০১৩ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে জাপানের মাচিয়ামা করপোরেশন এবং সিঙ্গাপুরের হুয়াসিং কনস্ট্রাকশন অ্যান্ড ট্রেডিং প্রাইভেট লিমিটেড থেকে ডাম্প ট্রাক ও নির্মাণ যন্ত্রপাতি আমদানি করে।
এমনকি বাংলাদেশে অবস্থিত জুয়েল এন্টারপ্রাইজ এবং যমুনা এন্টারপ্রাইজ নামের দুটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে চিনি ও এমএস প্লেট আমদানি করা হয় যেগুলোর হিসাবও পরবর্তীতে বন্ধ হয়ে যায়। উভয় প্রতিষ্ঠানের মালিক মোহাম্মদ আমিন উদ্দিন এবং তাদের অফিস বাদশা গ্রুপের ভবনে অবস্থিত।
যমুনা এন্টারপ্রাইজের ট্রেড লাইসেন্স অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটি স্ক্র্যাপ ও ভোগ্যপণ্য আমদানি, বিক্রয় ও বিপণনের সঙ্গে যুক্ত এবং এখান থেকেই মোহাম্মদ ইসা বাদশার মালিকানাধীন এমএম এন্টারপ্রাইজে অর্থ স্থানান্তরের প্রমাণ পাওয়া গেছে।
সমগ্র প্রক্রিয়া বিশ্লেষণে স্পষ্ট হয় মোহাম্মদ ইসা বাদশা একটি সুপরিকল্পিত ও বিস্তৃত নেটওয়ার্কের মাধ্যমে দেশের অর্থ আত্মসাৎ করে বিদেশে পাচার করেছেন। এর পেছনে ব্যবহৃত হয়েছে নানা ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, আমদানিকৃত পণ্য এবং আন্তর্জাতিক আর্থিক লেনদেনের জাল। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এখন এই জাল ছিন্ন করতে কাজ করছে। তদন্তের অগ্রগতি ও আইনি পদক্ষেপের ওপর নির্ভর করবে ভবিষ্যতে এ ধরনের অপরাধ দমনের সক্ষমতা।

