ক্ষমতাচ্যুত সরকারের আমলে রাজনীতিকদের পাশাপাশি একাধিক সরকারি কর্মকর্তার বিরুদ্ধেও বিদেশে অর্থ পাচারের অভিযোগ উঠেছে। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) তথ্য অনুযায়ী, এসব কর্মকর্তাদের বড় একটি অংশই দ্বৈত নাগরিকত্বধারী। ফলে বাংলাদেশের প্রচলিত আইনের আওতায় পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনা কঠিন হয়ে পড়েছে বলে জানিয়েছেন সংস্থাটির কর্মকর্তারা।
দেশ থেকে অর্থ পাচার রোধে এবার দুদক দ্বৈত নাগরিকত্বধারী সরকারি চাকরিজীবীদের শনাক্ত করতে তৎপর হয়েছে। প্রাথমিক অনুসন্ধানে সংস্থাটি জানতে পেরেছে, অন্তত এক হাজার সরকারি কর্মকর্তা বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নাগরিকত্ব গ্রহণ করেছেন। এদের অনেকেই বর্তমানে দেশে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরে কর্মরত রয়েছেন। দুদক ইতিমধ্যে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সুরক্ষা সেবা বিভাগ, পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চ (এসবি), ইমিগ্রেশন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তরসহ চারটি দপ্তরে চিঠি দিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নাগরিকত্বসংক্রান্ত তথ্য চেয়েছে।
দুদকের এক মহাপরিচালক কালবেলাকে জানান, অনেক সরকারি কর্মকর্তা উচ্চতর ডিগ্রির অজুহাতে বিদেশে যান এবং সেখানকার নাগরিকত্ব অথবা স্থায়ী আবাসনের অনুমতি নেন। দেশে ফিরে তারা নামমাত্র কোনো বিদেশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ডিগ্রি দেখিয়ে ছুটি বৈধ করেন। এরপর সুযোগ বুঝে দুর্নীতির মাধ্যমে অর্থ আত্মসাৎ করেন এবং হুন্ডির মাধ্যমে তা বিদেশে পাচার করে নিরুদ্দেশ হন। কেউ কেউ পরবর্তীতে বাংলাদেশের নাগরিকত্বও প্রত্যাহার করে নেন ফলে তাদের আইনের আওতায় আনা আরো জটিল হয়ে পড়ে।
এই কর্মকর্তা আরো জানান, বিগত সময়ে যারা হাজার হাজার কোটি টাকা পাচার করেছেন তাদের প্রায় প্রত্যেকেরই দ্বৈত নাগরিকত্ব রয়েছে। বর্তমানে সরকারি দপ্তরে কর্মরত অন্তত এক হাজার বিদেশি নাগরিকত্বধারী কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগের সত্যতা যাচাই করছে দুদকের গোয়েন্দা ইউনিট।
আইন অনুযায়ী, কোনো সরকারি কর্মকর্তা বিদেশি নাগরিকত্ব গ্রহণ করতে পারেন না। সরকারি চাকরি আইন, ২০১৮-এর ৪০ ধারার উপধারা ১-এ বলা হয়েছে, “কোনো সরকারি কর্মচারী বিদেশি কোনো রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব গ্রহণ করিতে পারিবেন না।” উপধারা ২ অনুযায়ী, “কোনো কর্মচারী যদি এই বিধান লঙ্ঘন করেন তবে তাঁকে কারণ দর্শানোর সুযোগ দিয়ে চাকরি অবসানের আদেশ দেওয়া যাবে।”
দুদকের কাছে আসা তথ্য অনুসারে, দ্বৈত নাগরিকত্বধারীদের মধ্যে রয়েছেন সাবেক মুখ্য সচিব আহমদ কায়কাউস, সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব কবির বিন আনোয়ার, দুদকের সাবেক সচিব মো. মাহবুব হোসেন এবং পুলিশের সাবেক ডিআইজি হারুন অর রশিদ। এ ছাড়া দুদকের একজন সাবেক কমিশনারের দ্বৈত নাগরিকত্ব থাকার তথ্যও পাওয়া গেছে।
সরকারি দপ্তরগুলো যেখানে এসব কর্মকর্তা নিযুক্ত ছিলেন বা রয়েছেন, তার মধ্যে রয়েছে পুলিশ, বিআরটিএ, বাংলাদেশ ব্যাংক, রাজউক, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, গাজীপুর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, স্বরাষ্ট্র, পররাষ্ট্র, গৃহায়ন ও গণপূর্ত, জনপ্রশাসন, সমাজকল্যাণ, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি, স্থানীয় সরকার ও সমবায় এবং বাণিজ্য ও অর্থ মন্ত্রণালয়। শুধু তাই নয় দেশের বেশ কয়েকটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষকও এই তালিকায় রয়েছেন।
দুদকের পাঠানো চিঠিতে বলা হয়েছে, কিছু দুর্নীতিবাজ সরকারি কর্মকর্তা তথ্য গোপন করে বিদেশি পাসপোর্ট গ্রহণ করেছেন এবং তা ব্যবহার করে বাংলাদেশ ত্যাগ করেছেন। অনেকেই বর্তমানে বিদেশে অবস্থান করে আইনগত পদক্ষেপ এড়ানোর চেষ্টা করছেন। এসব কর্মকর্তা সরকারের নিয়মনীতি লঙ্ঘন করে একাধিক পাসপোর্ট গ্রহণ করেছেন এবং দেশের অর্থ দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জন করে বিদেশে পাচার করছেন। এসব কর্মকাণ্ডে তারা দেশের অর্থনীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করছেন এবং প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার পরিপন্থি ভূমিকা রাখছেন।
চিঠিতে আরও বলা হয়, দণ্ডবিধির ২১ ধারা, দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন, ১৯৪৭-এর ২ নম্বর ধারা এবং ব্যাংক কোম্পানি আইন, ১৯৯১-এর ১১০ ধারাসহ অন্যান্য আইনের আলোকে এসব কর্মকর্তা “পাবলিক সার্ভেন্ট” হিসেবে বিবেচিত হন। এ প্রেক্ষাপটে তাদের দ্বৈত নাগরিকত্ব নেওয়ার তথ্য যাচাই-বাছাই করা জরুরি।
দুদক চিঠিতে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোকে সরকারি চাকরিজীবীদের পাসপোর্ট ও নাগরিকত্ব সম্পর্কিত সব তথ্য সরবরাহের অনুরোধ জানিয়েছে। সংস্থাটির বক্তব্য, বিদেশি নাগরিকত্ব গ্রহণকারী সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বাংলাদেশের প্রতি দায়বদ্ধতা হারিয়ে ফেলেন এবং প্রকারান্তরে দেশে দুর্নীতির প্রসারে ভূমিকা রাখেন।
বর্তমান প্রেক্ষাপটে দুদকের এই উদ্যোগ রাষ্ট্রীয় স্বার্থে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। সরকারি চাকরিতে নিয়োজিতদের স্বচ্ছতা ও নৈতিক দায়িত্ব নিশ্চিত করতে দ্বৈত নাগরিকত্ব সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ ও যাচাইয়ে দুদকের কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে বলেও জানা গেছে।

