চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির ভূজপুর এখন যেন এক অপরাধের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে। খুন, ছিনতাই, চাঁদাবাজি, অপহরণ, জমি দখল, গাছ পাচার থেকে শুরু করে পাহাড় কেটে ধ্বংস করার মতো ঘটনা এখানে প্রায় প্রতিদিনই ঘটছে। এমন অবস্থায় সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে ব্যবসায়ী শিক্ষার্থী সবার জীবন যেন আতঙ্কের ছায়ায় ঢাকা পড়েছে। অথচ এসব অপরাধে পুলিশের কার্যকর তৎপরতা নেই বলেই অভিযোগ স্থানীয়দের।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, গত ছয় মাসেই ভূজপুর থানায় অন্তত ৯টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। সর্বশেষ ৬ এপ্রিল রোববার, সন্তানের হাতে প্রাণ হারান ৫৫ বছর বয়সী বৃদ্ধা জুলেখা খাতুন। এর আগে ৩ এপ্রিল মাসুম (৩৩) নামে এক যুবক খুন হন। একই দিন জঙ্গল হারুয়ালছড়ি গ্রামের ১৩ বছর বয়সী কিশোর তর্ম রায় বন্ধুদের দায়ের কোপে গুরুতর জখম হন এবং পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মারা যান।
এরও আগে, ১৮ মার্চ শান্তিরহাটে আধিপত্য বিস্তার এবং মোটরসাইকেল ছিনতাইকে কেন্দ্র করে রমজান আলী (২২) নামে এক যুবদল কর্মী প্রতিপক্ষের ছুরিকাঘাতে নিহত হন। ২৭ ফেব্রুয়ারি নিখোঁজ হওয়ার দুইদিন পর নিউ দাঁতমারা চা বাগানে পাওয়া যায় অটোচালক মো. বেলাল উদ্দিনের গলাকাটা মরদেহ।
১ ফেব্রুয়ারি দাঁতমারা ইউনিয়নের বড় বেতুয়া এলাকায় বিএনপি কর্মী মো. শহীদ (৩২) পিটিয়ে হত্যা হন। ১২ জানুয়ারি হারুয়ালছড়িতে মা ও ভাইয়ের ছুরির আঘাতে নিহত হন ১৮ বছরের যুবতী আনিকা আক্তার। এর তিন দিন আগে, ৯ জানুয়ারি বালু উত্তোলনে বাধা দেওয়ার জেরে বাগানবাজারে বৃদ্ধ কৃষক দুলায়েত হোসেন দুলাল (৬৫) পিটিয়ে মারা যান। আর গত বছরের ২৯ নভেম্বর দাঁতমারা ইউনিয়নে নিখোঁজের ১৩ দিন পর একটি পরিত্যক্ত টয়লেট থেকে উদ্ধার করা হয় ছয় বছর বয়সী শিশু তাবাচ্চুমের মরদেহ।
হত্যাকাণ্ড ছাড়াও ভূজপুরে বেড়েছে ছিনতাই, ডাকাতি ও অপহরণের মতো অপরাধ। গত ২ ফেব্রুয়ারি সুয়াবিলে বসতঘরে ঢুকে মহিনুদ্দিন নামে এক যুবককে কুপিয়ে জখম করে লুটপাট চালানো হয়। ৫ মার্চ গভীর রাতে বিএনপির এক নেতার নেতৃত্বে সড়কে ব্যারিকেড দিয়ে পুলিশের ভ্যান থেকে ছিনিয়ে নেওয়া হয় ৬ আসামিকে। ২৯ জানুয়ারি স্কুলে যাওয়ার পথে দশম শ্রেণির এক ছাত্রীকে মাইক্রোবাসে তুলে অপহরণের চেষ্টার ঘটনায় ৪ জনকে আটক করে পুলিশ।
এছাড়া ২০ ফেব্রুয়ারি সরকারি মামলার সাক্ষী হওয়ায় ইউনুছ মিয়া সুমন নামের এক ইউপি সদস্য বাগানবাজারে হামলার শিকার হন। একই এলাকায় কৃষক হত্যার বিচারের দাবিতে আয়োজিত মানববন্ধনেও দুপক্ষের সংঘর্ষ ঘটে।
ভূজপুরের আরও একটি মারাত্মক সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে অবৈধভাবে মাটি কাটা ও পাহাড় নিধন। বিশেষ করে থানার ছয়টি ইউনিয়নে সমানতালে চলছে মাটি খেকোদের দৌরাত্ম্য। প্রতিদিন কৃষিজমির টপসয়েল ও পাহাড় কেটে তা সাবাড় করে দেওয়া হচ্ছে। উপজেলা নির্বাহী অফিসার কিছুটা তৎপর থাকলেও পুলিশ প্রশাসনের ভূমিকায় রহস্যের ছায়া দেখা যাচ্ছে বলে মনে করেন স্থানীয়রা।
সন্ধ্যা ঘনালেই ভূজপুরের বিভিন্ন এলাকায় অপরাধীরা হয়ে ওঠে বেপরোয়া। সুয়াবিল থেকে গার্ডের দোকান, হেয়াকো, জুজখোলা ও তারাখো এলাকার বাসিন্দারা জানায়, সড়কে ছিনতাই ও বাসাবাড়িতে চুরি এখন নিয়মিত ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এসব ঘটনার সঙ্গে জড়িত অপরাধীরা প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়ালেও পুলিশ তেমন কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না বলেও অভিযোগ রয়েছে।
ভূজপুরের স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুল্লাহ বিন হক বলেন, “দিন দিন এখানে অপরাধ বাড়ছে কিন্তু অপরাধীরা যেন কিছুই ভয় পাচ্ছে না। এভাবে চলতে থাকলে সাধারণ মানুষ আর স্বাভাবিক জীবন যাপন করতে পারবে না।”
এ বিষয়ে ভূজপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মাহবুবুল হক জানান, “আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে পুলিশ কাজ করে যাচ্ছে। যেসব হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে তার বেশিরভাগের আসামিদের গ্রেফতার করে আদালতে পাঠানো হয়েছে।”
ভূজপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, “রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ যদি একে অপরের প্রতি সহনশীল হন এবং ইতিবাচক মনোভাব পোষণ করেন, তাহলে যেকোনো অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। এতে পুরো উপজেলায় শান্তি ফিরিয়ে আনা যাবে।”
তবে ভূজপুরের বাস্তবতা বলছে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও স্থানীয় প্রশাসনের কার্যকর সমন্বয় ছাড়া অপরাধের এ লাগাম টানা কঠিন হয়ে উঠছে। অপরাধমুক্ত একটি ভূজপুর গড়তে এখনই প্রয়োজন যৌথ উদ্যোগ ও কঠোর পদক্ষেপ।

