গত দেড় দশকে বাংলাদেশের রাজনীতি ও ব্যবসা-বাণিজ্যের এক গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে ওঠে নারায়ণগঞ্জ। এই সময়ের বেশির ভাগ সময়ই জেলার রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ ছিল ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের ঘনিষ্ঠ ওসমান পরিবারের হাতে। শামীম ওসমান ও সেলিম ওসমান—এই পরিবারের দুই শীর্ষ সদস্য—সম্পদের দিক থেকে একেকজন প্রায় পাঁচ হাজার কোটি টাকার মালিক। গার্মেন্টস, শিপিং, পরিবহন, আবাসনসহ বিভিন্ন খাতে তাদের ব্যবসা বিস্তৃত ছিল। কিন্তু ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের আগে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান পরিবারের প্রভাবশালী সদস্যরা। বর্তমানে তারা বিদেশে অবস্থান করছেন এবং তাদের ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে নতুন অংশীদার খুঁজছেন।
ওসমান পরিবারের সদস্যদের আগে থেকেই দেশের একটি শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়িক গ্রুপে বেনামি অংশীদারত্ব ছিল। রাজনৈতিক পরিস্থিতি পরিবর্তনের পর সেখানে তাদের অংশীদারত্ব আরো বাড়ানো হয়েছে। একইসঙ্গে তারা যুক্ত হয়েছেন বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির এক সদস্যের সঙ্গে। এই বিএনপি নেতার গুলশানের বাসায় শামীম ওসমান এক সময় ভাড়া থাকতেন। বর্তমানে তিনি ওসমান পরিবারের সম্পত্তির দেখভাল করছেন।
তবে একই সময়ে নারায়ণগঞ্জের আরেক প্রভাবশালী নেতা সাবেক পাট ও বস্ত্রমন্ত্রী গোলাম দস্তগীর গাজী। ব্যবসা ক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়েছেন। তিনি বর্তমানে কারাগারে। গাজী টায়ারসহ তার বেশ কয়েকটি কারখানা অভ্যুত্থানের পর পুড়িয়ে দেওয়া হয়। যেগুলো অক্ষত ছিল সেগুলোও গত আট মাস ধরে বন্ধ। তার পরিবার এখন এসব কারখানা সচল করতে অংশীদার খুঁজছে। কিন্তু স্থানীয় বিএনপির দুটি গ্রুপের মধ্যে বিবাদের কারণে আলোচনা জটিল হয়ে উঠেছে।
ব্যবসায়িক অংশীদার খুঁজছেন দ্বাদশ সংসদে কুমিল্লা-৮ আসনের সংসদ সদস্য ও এসবিএসি ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান আবু জাফর মো. শফিউদ্দিন শামীমও। এসকিউ গ্রুপের এই কর্ণধার দীর্ঘদিন ধরে ওবায়দুল কাদের ও নসরুল হামিদ বিপুসহ ক্ষমতাধরদের ঘনিষ্ঠ ছিলেন। অভ্যুত্থানের পর পালিয়ে যাওয়ার পর এখন তিনি বিএনপিপন্থী এক ব্যবসায়ীর সঙ্গে অংশীদারিত্ব গড়ছেন। এসবিএসি ব্যাংকে নিজের একটি পরিচালক পদের শেয়ার ওই ব্যবসায়ীর নামে হস্তান্তর করা হচ্ছে।
একই পরিণতির শিকার হয়েছেন সাবেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম। অভ্যুত্থানের ঠিক আগে ৫ আগস্ট তিনি চুয়াডাঙ্গা সীমান্ত দিয়ে দেশ ছাড়েন এবং থাইল্যান্ড হয়ে রাশিয়ায় পাড়ি জমান। রেনেসাঁ গ্রুপের মাধ্যমে তিনি বস্ত্র, পোশাক, আবাসন, হাসপাতালসহ বিভিন্ন খাতে যুক্ত ছিলেন। এখন বিদেশে বসে ব্যবসার দিকনির্দেশনা দিচ্ছেন এবং রাজশাহী অঞ্চলের বিএনপি নেতাদের সঙ্গে অংশীদারত্বের আলোচনা চালাচ্ছেন।
বণিক বার্তার অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, অন্তত এক ডজন প্রভাবশালী আওয়ামী লীগ নেতা অংশীদার খুঁজছেন কিংবা তাদের ব্যবসা চালু রাখতে বিএনপিপন্থীদের সঙ্গে গোপন সমঝোতা করছেন। কারণ অভ্যুত্থানের পর ঠিকাদারি ব্যবসা কার্যত অচল হয়ে পড়েছে এবং অধিকাংশ শিল্প-কারখানা উৎপাদন বন্ধ করে দিয়েছে। এমনকি সালমান এফ রহমানের মতো বড় ব্যবসায়ীর একাধিক প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছে। এই পরিস্থিতিতে কেউ কেউ আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধুদের মাধ্যমে বিএনপি নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন আবার কেউ বিদেশে সম্পদ পাচার করে ব্যবসা টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করছেন।
তবে বেশির ভাগ নেতাই নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক থাকলেও সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক ও প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী স্বীকার করেছেন, আওয়ামী লীগ নেতা-সমর্থক ও ব্যবসায়ীরা বর্তমানে বিএনপি-জামায়াতের রোষানলে পড়েছেন। ফলে অনেকেই ব্যবসা পরিচালনায় হিমশিম খাচ্ছেন। বিনিয়োগের পরিবেশও নেই বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তবে আওয়ামী লীগ নেতারা বিএনপি নেতাদের সঙ্গে অংশীদারিত্ব করছেন কিনা সে বিষয়ে কোনো তথ্য তার কাছে নেই বলে জানান।
২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের পর থেকে দলটির অনেক নেতা-নেত্রী রাজনীতির পাশাপাশি ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করতেন। বিশেষ করে ঠিকাদারি খাতে ছিল একচেটিয়া দখল। এসব ঠিকাদাররা সরকারি প্রকল্পের কাজ নিজেরা না করে তা বিক্রি করে দিতেন অন্যদের কাছে। এই সময়েই শেখ হাসিনার নেতৃত্বে অনেক পেশাদার ব্যবসায়ীকে আওয়ামী লীগে টেনে আনা হয় যারা পরবর্তীতে সংসদ নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন পান। ২০২৪ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ২৬৫ জন প্রার্থীর মধ্যে ১৭০ জনই ছিলেন ব্যবসায়ী যা ছিল প্রার্থীদের ৬৪ দশমিক ১৫ শতাংশ।
হলফনামা অনুযায়ী, ১৬ জন প্রার্থীর সম্পদ ছিল শতকোটি টাকার ওপরে। গাজী গ্রুপের চেয়ারম্যান গোলাম দস্তগীর গাজীর সম্পদ ছিল ১৪৫৭ কোটি টাকা, আবু জাফর মো. শফিউদ্দিনের ৩৭২ কোটি টাকা, ইউসুফ আব্দুল্লাহ হারুনের ৩০৫ কোটি টাকা। সালমান এফ রহমান যিনি এফবিসিসিআই ও বিটিএমএর সাবেক সভাপতি, তার সম্পদের পরিমাণ ছিল ৩৯৪ কোটি টাকা। তিনি বর্তমানে কারাগারে আর বেক্সিমকো গ্রুপের এক ডজন কোম্পানি বন্ধ হয়ে গেছে।
তালিকায় আরো আছেন ডায়মন্ড ওয়ার্ল্ডের দিলীপ কুমার আগরওয়ালা, নিপা গ্রুপের মো. খসরু চৌধুরী, ফেনীর আলাউদ্দিন আহমেদ চৌধুরী নাসিম ও নিজাম উদ্দিন হাজারী। সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাভেদের বিদেশে রয়েছে প্রায় ২৯৫ মিলিয়ন ডলারের সম্পত্তি যার মধ্যে যুক্তরাজ্যে ৩১৫টি, দুবাইয়ে ১৪২টি, নিউইয়র্ক, ফ্লোরিডা ও নিউজার্সিতেও রয়েছে সম্পদ। তিনি এখন যুক্তরাজ্য থেকে তার আরমিট গ্রুপের ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করছেন এবং অংশীদার খুঁজছেন।
চট্টগ্রাম বন্দরে ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন হাছান মাহমুদ ও তার পরিবার। বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের জমিও তাদের নিয়ন্ত্রণে ছিল যা সম্প্রতি উদ্ধার করা হয়েছে। তবে এ পরিবারের ব্যবসা এখনো সচল এবং অভিযোগ রয়েছে এতে বিএনপির নেতারাও সহযোগিতা করছেন।
ফেবিয়ান গ্রুপের মালিক সাবেক মন্ত্রী তাজুল ইসলাম, কোয়েস্ট গ্রুপের মাহবুব-উল আলম হানিফ, সাবেক অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল—তিনিও নিজের ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে অংশীদার খুঁজছেন। তবে তাদের কেউই নাম প্রকাশ করে কোনো মন্তব্য দিতে রাজি হননি।
আওয়ামী লীগের ত্রাণ ও দুর্যোগ সম্পাদক আমিনুল ইসলাম বলেন, অনেক নেতার ব্যবসা এখন ধ্বংসের পথে। লভ্যাংশ তো দূরের কথা মূলধনও হারাচ্ছেন তারা। ফলে বহু প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছে এবং অনেক মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়েছেন।
এ তালিকায় রয়েছেন বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী হিসেবে বহুবছর দায়িত্ব পালন করা নসরুল হামিদ বিপুও। তার বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও সিঙ্গাপুরে হাজার কোটি টাকা পাচারের অভিযোগ এনেছে দুর্নীতি দমন কমিশন। তার মালিকানাধীন পাওয়ারকো ইন্টারন্যাশনাল কোম্পানি এবং অন্যান্য সম্পদ এখন বিক্রি করে দিচ্ছেন তিনি। যেগুলো বিক্রি সম্ভব হচ্ছে না সেগুলোর জন্য খুঁজছেন নতুন অংশীদার।
রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর আওয়ামী লীগের এই ধনকুবেরদের একটি বড় অংশ দেশ ছেড়েছেন। কেউ কেউ ব্যবসা ধরে রাখতে প্রতিপক্ষ দলের সহায়তা নিচ্ছেন। আর যারা রয়ে গেছেন তারা বিপর্যয়ের মধ্যে পড়ে হন্যে হয়ে খুঁজছেন ব্যবসায়িক অংশীদার।

