পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠান ফু-ওয়াং ফুডস লিমিটেডের ২০২৩-২৪ অর্থবছরের আর্থিক হিসাব বিশ্লেষণে উঠে এসেছে একাধিক অসংগতি ও জালিয়াতির প্রমাণ। প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক প্রতিবেদনে ৫৮ কোটি ৬৭ লাখ টাকার স্থায়ী সম্পদ দেখানো হলেও এ সংক্রান্ত কোনো ফিক্সড অ্যাসেট রেজিস্টার নেই যা ওই সম্পদের যথার্থতা যাচাইয়ের প্রক্রিয়াকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
নিরীক্ষকরা জানিয়েছেন, হিসাব মান অনুযায়ী তিন থেকে পাঁচ বছর পর পর সম্পদের মূল্যায়ন করা বাধ্যতামূলক হলেও ফু-ওয়াং ফুডস সর্বশেষ ২০১৫ সালে তা করেছে। ফলে প্রতিষ্ঠানটির স্থায়ী সম্পদ সংক্রান্ত তথ্যের যথার্থতা নিয়ে সন্দেহ থেকেই যাচ্ছে।
এছাড়া মজুত পণ্য হিসাবেও অনিয়ম পাওয়া গেছে। আর্থিক প্রতিবেদনে প্রতিষ্ঠানটি ৯ কোটি ১৩ লাখ টাকার মজুত পণ্য দেখালেও সরেজমিন পরিদর্শনে দেখা যায়, ৩৪০টি আইটেমের মধ্যে ১০৪টির কাঁচামাল, বিক্রিযোগ্য পণ্য ও প্যাকিং উপকরণের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ অসামঞ্জস্য রয়েছে। কাঁচামাল কেনার জন্য যে ৩ কোটি ২১ লাখ টাকা অগ্রিম দেওয়া হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, তারও বেশিরভাগ—প্রায় ২ কোটি ৮৮ লাখ টাকা—পূর্ববর্তী বছরের হিসাবভুক্ত। নিরীক্ষকের প্রশ্নের পরও কোম্পানির ব্যবস্থাপনা এই টাকার ব্যাখ্যা দিতে পারেনি। এমনকি কাঁচামাল সরবরাহকারীদের তালিকাও দেখাতে ব্যর্থ হয়েছে তারা। এতে অগ্রিম প্রদানের প্রকৃততা নিয়ে গুরুতর অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
এছাড়া আর্থিক হিসাবে সরবরাহকারীদের কাছে ১৭ কোটি ৮৬ লাখ টাকা পাওনা রয়েছে বলে দেখানো হলেও যাচাইয়ের জন্য ২৭ জন পাওনাদারকে চিঠি পাঠিয়ে মাত্র ১১ জনের পাওনার সত্যতা পেয়েছেন নিরীক্ষকরা। এর ফলে কোম্পানির হিসাবের সঙ্গে ২ কোটি ১৯ লাখ টাকার গরমিল ধরা পড়েছে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—কোম্পানি ইচ্ছাকৃতভাবে লোকসান গোপন করে শেয়ারপ্রতি মুনাফা (ইপিএস) বাড়িয়ে দেখিয়েছে। নিরীক্ষকদের পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৯৯ লাখ টাকার লোকসান ইনকাম স্টেটমেন্টে দেখানোর পরিবর্তে সেটিকে রিটেইন্ড আর্নিংসে সমন্বয় করা হয়। এ জালিয়াতি না হলে শেয়ারপ্রতি মুনাফা ৯ পয়সা কমে যেত।
রিটেইন্ড আর্নিংস বা পুনঃবিনিয়োগযোগ্য মুনাফা নিয়ে আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য দিয়েছে নিরীক্ষক দল। তারা জানায়, ফু-ওয়াং ফুডসের আর্থিক হিসাবে ১০৭ কোটি ২২ লাখ টাকার ঋণাত্মক রিটেইন্ড আর্নিংস রয়েছে। অর্থাৎ কোম্পানিটির আর্থিক ঘাটতি এতটাই যে, সঞ্চিত মুনাফা তো দূরে থাক, ধার করে টিকে থাকতে হচ্ছে।
এই অনিয়মকে বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে সরাসরি প্রতারণা বলে মন্তব্য করেছেন ট্রেজার সিকিউরিটিজের শীর্ষ কর্মকর্তা মোস্তফা মাহবুব উল্লাহ। তিনি বলেন, ‘‘যেসব কোম্পানির আর্থিক হিসাবে এ রকম নয়ছয় রয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া দরকার। তা না হলে বিনিয়োগকারীদের আস্থা হারিয়ে যাবে, আর পুঁজিবাজার দুর্বল হয়ে পড়বে।’’
একসময় লাভজনক ব্যবসা পরিচালনা করা প্রতিষ্ঠানটি এখন টানা তিন বছর লোকসানে চলছে। বিনিয়োগকারীদের মুনাফা না দিয়ে একের পর এক বছর কাটিয়ে দিচ্ছে তারা। ২০১৯ সালে মাত্র ২ শতাংশ, ২০২০ সালে ১ দশমিক ৬৫ শতাংশ লভ্যাংশ দিলেও ২০২১ ও ২০২২ সালে কোনো লভ্যাংশই দেয়নি। সর্বশেষ ২০২৩ সালে শেয়ারপ্রতি মাত্র ৫ পয়সা, অর্থাৎ দশমিক ৫ শতাংশ লভ্যাংশ দিয়েছে, যা প্রকারান্তরে বিনিয়োগকারীদের প্রতি অবহেলারই বহিঃপ্রকাশ।
এ বিষয়ে কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মিয়া মামুনের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি। কোম্পানির সচিব মোহাম্মদ জামানকেও একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি।
পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)-এর পরিচালক ও মুখপাত্র আবুল কালাম জানিয়েছেন, পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে কমিশন কাজ করে যাচ্ছে। তিনি বলেন, ‘‘কারও আর্থিক হিসাবে কারচুপি বা অসংগতি ধরা পড়লে আমরা আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেব।’’
২০০০ সালে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়া ফু-ওয়াং ফুডসের পরিশোধিত মূলধন বর্তমানে ১১০ কোটি ৮৪ লাখ টাকা। এর মধ্যে উদ্যোক্তা-পরিচালক ব্যতীত অন্যান্য শ্রেণির বিনিয়োগকারীদের হাতে রয়েছে ৯২ দশমিক ১৫ শতাংশ শেয়ার। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, কোম্পানিটির শেয়ারমূল্য ২০ পয়সা কমে ১৬ টাকা ৫০ পয়সায় লেনদেন হয়।
সবমিলিয়ে ফু-ওয়াং ফুডসের বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়ম, মুনাফা গোপন এবং বিনিয়োগকারীদের ঠকানোর অভিযোগ প্রমাণসহ উঠে এসেছে, যা পুঁজিবাজারের সামগ্রিক স্থিতিশীলতার জন্য এক গভীর হুমকি হিসেবেই দেখা হচ্ছে। তদন্তের ভিত্তিতে দ্রুত কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি উঠেছে বাজার সংশ্লিষ্টদের পক্ষ থেকে।

