উদ্বোধনের নয় বছর পর বরিশালের গ্রিন সিটি পার্কে প্রবেশ ও রাইড ব্যবহারে টিকিট চালু করেছে বরিশাল সিটি করপোরেশন (বিসিসি)। ঈদুল ফিতরের দিন থেকে জনপ্রতি ১০ টাকা করে প্রবেশমূল্য নির্ধারণ করে সেখানে গার্ড বসানো হয়েছে। একইসঙ্গে পার্কসংলগ্ন বেলস পার্ক এলাকায় ফুটপাত ও সড়ক দখল করে গড়ে ওঠা দেড় শতাধিক ভ্রাম্যমাণ দোকান থেকেও দৈনিক ভিত্তিতে টাকা তোলা হচ্ছে। এসব উদ্যোগে নগরবাসীর একাংশ ক্ষোভ প্রকাশ করেছে। বিশেষ করে যারা এতদিন বিনামূল্যে পার্কটি ব্যবহার করে আসছিলেন।
নগরের বহু বাসিন্দা ও অভিভাবকদের অভিযোগ, গ্রিন সিটি পার্কে দীর্ঘদিন ধরে প্রবেশ ও শিশুদের রাইড ব্যবহারে কোনো ধরনের টিকিট বা ফি ছিল না। হঠাৎ করে ঈদের দিন থেকে তা চালু হওয়ায় অনেকেই বিরূপ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। তারা বলছেন, দীর্ঘদিন ধরে নগরের শিশুদের বিনোদনের একমাত্র উন্মুক্ত পার্কটি হঠাৎ করে ‘সেবামূল্যের’ নামে বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহৃত হওয়ায় দরিদ্র পরিবারের শিশুরা এতে প্রবেশ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
তবে সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা রেজাউল বারীর দাবি, পার্কের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, নিরাপত্তা ও রক্ষণাবেক্ষণের খরচ মেটাতে ১৫ জন কর্মী নিযুক্ত আছেন এবং তাদের বেতন ও অন্যান্য ব্যয়ের জন্যই সেবামূল্য হিসেবে ১০ টাকা করে প্রবেশমূল্য ধার্য করা হয়েছে। একই সঙ্গে বেলস পার্ক এলাকার ভ্রাম্যমাণ দোকানগুলো থেকে ব্যবসার ধরন অনুযায়ী দৈনিক ২০ থেকে ৫০ টাকা পর্যন্ত আদায় করা হচ্ছে। তার ভাষ্য, এসব দোকানের কারণে পার্ক এলাকায় ময়লার স্তূপ জমে থাকত যা পরিষ্কারের খরচ মেটাতেই এই অর্থ তোলা হচ্ছে।
২০১৬ সালের ২৯ জানুয়ারি তৎকালীন মেয়র আহসান হাবিব কামালের উদ্বোধনকৃত এক একর আয়তনের গ্রিন সিটি পার্ক নির্মাণে এক কোটি ৪২ লাখ টাকা ব্যয় হয়। সেখানে রয়েছে ১৪টি রাইড, দুটি খাবারের ঘর, একটি বিশ্রামাগার, ১০টি বসার বেঞ্চ ও একটি খেলার মাঠ। উদ্বোধনের সময় ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল, পার্কে প্রবেশ ও রাইড ব্যবহারে কোনো ধরনের ফি থাকবে না।
তৎকালীন মেয়র আহসান হাবিব কামাল ছিলেন বরিশাল মহানগর বিএনপির সভাপতি ও কেন্দ্রীয় বিএনপির মৎস্যজীবী বিষয়ক সম্পাদক। তিনি ১৯৯১ সাল থেকে বরিশাল পৌরসভার কমিশনার, ১৯৯৫ সালে চেয়ারম্যান ও প্রশাসকের দায়িত্ব পালন করেন। বরিশাল সিটি করপোরেশন প্রতিষ্ঠিত হলে ২০০২-০৩ সালে ভারপ্রাপ্ত মেয়র এবং ২০১৩ সালে নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
তবে বর্তমানে সিটি করপোরেশনের ক্ষমতাপ্রাপ্ত প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ৩১ মার্চ থেকে টিকিট চালুর সিদ্ধান্ত কার্যকর করেন। এতে অভিভাবকরা বিস্মিত ও ক্ষুব্ধ হন। তাদের কেউ কেউ ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের’ নেতাদের জানালে ওইদিনই বিভাগীয় কমিশনার মো. রায়হান কাওছার ঘটনাস্থলে গিয়ে জানান, এই সিদ্ধান্ত সিটি করপোরেশনেরই।
কমিশনার আরও বলেন, টিকিটের অর্থ থেকে পার্ক পরিচালনার যাবতীয় খরচ মেটানো হবে এবং এতে করে পার্কের সার্বিক অবস্থা আগের চেয়ে ভালো থাকবে। সিটি করপোরেশন সূত্র জানায়, গ্রিন পার্ক থেকে প্রতিদিন গড়ে ২০ হাজার টাকা আয় হচ্ছে যা দিয়ে কর্মীদের বেতন ও রক্ষণাবেক্ষণ খরচ মেটানো হচ্ছে।
ঈদের পরদিন পার্কে আসা অভিভাবক সোহরাব হোসেন ও আসমা আক্তার জানান, আগে যখন ফ্রিতে প্রবেশ করা যেত, তখন পার্কের পরিবেশ তেমন ভালো ছিল না। তবে এখন রাইডসহ অন্যান্য অবকাঠামোর অবস্থা উন্নত হয়েছে। যদিও তাদের দুশ্চিন্তা ১০ টাকা প্রবেশমূল্যের কারণে গরিব শিশুরা এখন আর পার্কে প্রবেশ করতে পারবে না।
অন্যদিকে অভিভাবক মৌরিন আক্তার অভিযোগ করে বলেন, আগের মেয়র পার্কটিকে সকলের জন্য উন্মুক্ত রেখেছিলেন। বর্তমান প্রশাসক টিকিট চালু করে তা সংকুচিত করে দিয়েছেন। পার্কে কোনো নতুন রাইড কিংবা সুবিধা যুক্ত না করেই টিকিট চালু করা হয়েছে। এতে সব শিশুরা সমভাবে পার্ক উপভোগের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
অপরদিকে বেলস পার্ক সংলগ্ন ফুটপাত ও সড়ক দখল করে থাকা দোকানগুলো থেকে সিটি করপোরেশন যে অর্থ নিচ্ছে তা নিয়েও রয়েছে বিতর্ক। এসব দোকানে ফুচকা, শরবত, চা, চটপটি ও আইসক্রিম বিক্রি হয়। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিক্রেতারা জানান, প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা জায়গাটি পরিদর্শনের পর ব্যবসার ধরন অনুযায়ী টাকা নির্ধারণ করেন। তবে এতে তাদের দৈনিক খরচ বেড়ে গেছে।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) বরিশাল জেলার সদস্যসচিব রফিকুল আলম বলেন, পার্কে প্রবেশমূল্য নির্ধারণের বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন। তার মতে, ভ্রাম্যমাণ দোকানগুলো থেকেই যেহেতু টাকা তোলা হচ্ছে, সেটা একপ্রকার অবৈধ দোকানকে বৈধতা দেওয়ার শামিল। এতে নগরীর ফুটপাত ও সড়ক দখলে উৎসাহিত করা হচ্ছে। তিনি এই দোকানগুলো উচ্ছেদের দাবি জানান, যেন নগরের চলাচল স্বাভাবিক রাখা যায়।
সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা রেজাউল বারী জানান, নগরের অন্য কোনো এলাকায় এভাবে টাকা তোলা হয় না। শুধুমাত্র এই দুটি পার্ক এলাকার কথা বিবেচনা করে এই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। বরাদ্দ না থাকায় এবং পানির বিল, ট্যাক্সসহ নাগরিকদের কাছে বিপুল পরিমাণ অর্থ বকেয়া থাকায় এই মুহূর্তে করপোরেশনের পক্ষে খরচ মেটানো কঠিন হয়ে পড়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
এভাবে ‘সেবার’ নামে নগরের একটি উন্মুক্ত পার্ককে বাণিজ্যিক কাঠামোতে রূপান্তরের ফলে যে বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে তা দ্রুত সমাধানের জন্য কর্তৃপক্ষের উদ্যোগ নেওয়া জরুরি বলে মনে করছেন সচেতন নাগরিকরা।

