সিআইডির সাবেক প্রধান মোহাম্মদ আলী মিয়ার বিরুদ্ধে ব্যাপক অনিয়ম এবং দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। তাঁর আমলে পুলিশ অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) কার্যক্রমে বহু অনৈতিক কর্মকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে যা বর্তমানে বিভিন্ন সূত্র থেকে বেরিয়ে এসেছে। মোহাম্মদ আলী মিয়া শুধু সিআইডির অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠানে সিন্ডিকেট গড়ে তোলেননি বরং তিনি তৎকালীন সরকারের শীর্ষ নেতাদের বিরুদ্ধে মামলা দিয়ে ক্ষমতা কুক্ষিগত করতে চেয়েছিলেন।
সাবেক সিআইডি প্রধানের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে যে, তিনি সিআইডির প্রভাবশালী কর্মকর্তাদের নিয়োগ এবং পদোন্নতির মাধ্যমে একাধিক অনৈতিক কাজের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। এর মধ্যে অন্যতম হল, তিনি নোবেল বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে ফাঁসানোর জন্য একটি মিথ্যা মানি লন্ডারিং মামলার তদন্ত শুরু করেছিলেন। ২০২৩ সালের প্রথম দিকে, ড. ইউনূসের বিরুদ্ধে অনুসন্ধানের জন্য তিনি সিআইডির মানি লন্ডারিং শাখায় চিঠি পাঠান,যদিও কিছু কর্মকর্তার আপত্তির পরও তাঁর পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হয়। তবে ৭ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের পর আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর তার এই পরিকল্পনা ভেস্তে যায়।
মোহাম্মদ আলী মিয়া ক্ষমতার অপব্যবহার করে সিআইডির বিভিন্ন কর্মকর্তাকে বাধ্য করেছিলেন তাঁর নির্দেশ পালন করতে এবং যারা তার নির্দেশ না মানতেন তাদের বদলি বা কোণঠাসা করতেন। এর একটি উদাহরণ হল, তিনি সিআইডির পুলিশ সুপার রায়হানুল ইসলামকে যিনি বাংলাদেশ ব্যাংক রিজার্ভ চুরির মামলার তদন্ত করছিলেন সরিয়ে দেন কারণ তিনি মোহাম্মদ আলীর নির্দেশ মেনে বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তাদের নাম বাদ দিয়ে চার্জশিট দিতে রাজি হননি।
এছাড়া সিআইডির সাবেক প্রধান মোহাম্মদ আলী মিয়া একটি সিন্ডিকেট গড়ে তোলেন যার মাধ্যমে তিনি মামলা এবং অনুসন্ধান চালিয়ে বিপুল পরিমাণ অর্থ আদায় করতেন। তিনি একজন কর্মকর্তা ইমরান ভূইয়াকে তাঁর ক্যাশিয়ার হিসেবে কাজে লাগিয়েছিলেন যিনি বিভিন্ন অপরাধীদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করার জন্য অবৈধ অর্থ আদায় করতেন। এই সিন্ডিকেটের আরেকটি সদস্য ছিলেন সিআইডির অন্য কর্মকর্তারা। যারা মোহাম্মদ আলীর নির্দেশে বিভিন্ন ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে অর্থপাচারের অভিযোগে তদন্ত চালিয়ে সেগুলোর মাধ্যমে ঘুষ আদায় করতেন।
এছাড়া রিং আইডি মামলার মতো কিছু গুরুত্বপূর্ণ মামলায় মোহাম্মদ আলীর হস্তক্ষেপও ছিল। তদন্তের পর তিনি সিআইডির কর্মকর্তাদের প্রভাবিত করে কিছু ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে মামলার তদন্ত ফেলে দেন। রিং আইডির মালিকদের বিরুদ্ধে প্রায় ৩০২ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠে তবে মোহাম্মদ আলীর নির্দেশে তদন্তকারী কর্মকর্তা ওই মামলায় অবৈধ সুবিধা গ্রহণ করে অভিযুক্তদের বাঁচানোর জন্য আদালতে প্রতিবেদন দেন।
সিআইডির সাবেক প্রধান মোহাম্মদ আলী মিয়া ব্যাপক সম্পদের মালিক হয়ে উঠেছিলেন। রাজধানী ঢাকা এবং দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে তিনি নাম-বেনামে জমি, ফ্ল্যাট ও অন্যান্য সম্পদ কিনে রেখেছিলেন। এছাড়া তাঁর বিদেশে ব্যবসাও রয়েছে যেখানে তিনি অবৈধভাবে টাকা পাচার করতেন বলে অভিযোগ রয়েছে। একাধিক সূত্রের দাবি, তিনি মালয়েশিয়া ও লন্ডনে বিপুল পরিমাণ টাকা পাচার করেছেন।
এদিকে সিআইডি প্রধান হিসেবে মোহাম্মদ আলী মিয়ার সময়কালে মামলা নিষ্পত্তির সংখ্যা কমে যায়। তিনি তদন্তে বাধা দেন এবং মামলা করার ক্ষেত্রে কর্মকর্তাদের নিরুৎসাহিত করতেন। তাঁর আমলে সিআইডি থেকে ২৩ মাসে মাত্র ৩৯৮টি মামলা দায়ের করা হয়েছে যা আগের বছরের তুলনায় অনেক কম। এমনকি তিনি তদন্তের অনুমতি দেয়ার ক্ষেত্রে মাসের পর মাস বিলম্ব করতেন।
দুর্নীতি এবং অনিয়মের অভিযোগে দুদক গত ১৩ মার্চ মোহাম্মদ আলী মিয়া ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান শুরু করেছে। এই তালিকায় সিআইডির পাঁচ পুলিশ কর্মকর্তা নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে যারা তাঁর দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন।
মোহাম্মদ আলী মিয়া এবং তার সিন্ডিকেটের কার্যকলাপ বর্তমানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ও সুশীল সমাজের নজরে রয়েছে এবং তাদের বিরুদ্ধে তদন্ত চলমান রয়েছে।

