চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া উপজেলা যার বুক চিরে বয়ে গেছে কর্ণফুলী ও ইছামতী নদী এবং শিলক ও ঝংকার খাল, প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে সমৃদ্ধ হলেও এখন বালু উত্তোলনের নামে পরিবেশ ধ্বংসের এক করুণ চিত্র তুলে ধরছে। নদী ও খাল ঘিরে গড়ে ওঠা অন্তত ১০টি বালুমহাল থেকে প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ বালি উত্তোলন করা হয়।
এক সময় এসব বালুমহালের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ ছিল সাবেক ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতা ও সাবেক মন্ত্রী হাছান মাহমুদের পরিবারের হাতে। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রভাব খাটিয়ে বছর পর বছর নামমাত্র মূল্যে ইজারা নেয়া হতো আর নিয়ম ভেঙে উত্তোলন করা হতো অনুমোদনের কয়েক গুণ বেশি বালি।
প্রশাসনের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, পাহাড়ঘেরা রাঙ্গুনিয়া উপজেলা পার্বত্য রাঙ্গামাটি ও বান্দরবানের সঙ্গে সংযুক্ত হওয়ায় এখানকার নদী ও খালে প্রচুর পাহাড়ি বালির আগমন ঘটে। নির্মাণ কাজে এই বালির ব্যাপক চাহিদা থাকায় এর বাজারমূল্য অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় অনেক বেশি। দীর্ঘদিন ধরে এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে প্রভাবশালী মহল রীতিমতো একচ্ছত্র দখলদারি কায়েম করেছিল। অভিযোগ রয়েছে, সাবেক মন্ত্রী হাছান মাহমুদের ভাই এরশাদ মাহমুদ ছিলেন এসব বালুমহালের অলিখিত নিয়ন্ত্রক। বিভিন্ন নামে-বেনামে প্রতিষ্ঠান খুলে সরকারকে প্রতি ঘনফুটে মাত্র ৩০ পয়সা দিয়ে সরকারি সম্পদে ভাগ বসিয়ে বিপুল বিত্ত গড়ে তোলেন তারা।
চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন ২০২৪ সালের মার্চ মাসে রাঙ্গুনিয়ার সাতটি বালুমহালের জন্য নতুন করে দরপত্র আহ্বান করে, যেখানে ১৮ লাখ ৩৩ হাজার ৯৩৭ ঘনফুট বালি উত্তোলনের অনুমতি দিয়ে প্রতি ঘনফুটের সম্ভাব্য দর নির্ধারণ করা হয় গড়ে ৪ টাকা ৮৭ পয়সা। এতে স্পষ্ট হয়, এতদিন ধরে হাছান মাহমুদের পরিবারের সদস্যরা সরকারি মূল্য থেকে বহুগুণ কম মূল্যে বালি উত্তোলন করে আসছিলেন। এর পাশাপাশি অনুমোদিত সীমার চেয়ে কয়েকগুণ বেশি বালি উত্তোলনের ফলে কর্ণফুলী নদী, শিলক খাল, ইছামতী নদী ও ঝংকার খালের প্রকৃতি ও পরিবেশ চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। নদীভাঙন তীব্র আকার ধারণ করায় পানি উন্নয়ন বোর্ড প্রায় ৪০০ কোটি টাকার একটি প্রকল্প হাতে নিতে বাধ্য হয়।
পানি উন্নয়ন বোর্ড জানিয়েছে, অবাধ ও অনিয়ন্ত্রিত বালি উত্তোলনের ফলে নদী ও খালের তীর ধসে পড়ায় ২০১৮ সালে ‘চট্টগ্রাম জেলাধীন রাঙ্গুনিয়া ও বোয়ালখালী উপজেলা এবং রাঙ্গামাটির কাপ্তাই উপজেলার কর্ণফুলী ও ইছামতী নদী এবং শিলক খালসহ অন্যান্য খালের তীর রক্ষা’ প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। প্রায় ৩৯৮ কোটি টাকার এই প্রকল্পের আওতায় নদীতে জেগে ওঠা চর অপসারণ ও তীর রক্ষায় ব্লক স্থাপনের কাজ এখনো চলমান। প্রকৌশলীদের ভাষ্য অনুযায়ী, সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনায় বালি উত্তোলন না হওয়ায় নদীপাড়ের ঘরবাড়ি ও কৃষিজমি হুমকির মুখে পড়েছে।
সরেজমিনে অনুসন্ধানে দেখা গেছে, আওয়ামী লীগের সরকার পতনের পরও রাঙ্গুনিয়ায় হাছান মাহমুদের পরিবারের অবৈধ বালু ব্যবসা বন্ধ হয়নি। বরং স্থানীয় বিএনপির একাধিক নেতার সহযোগিতায় তা অব্যাহত রয়েছে। আত্মগোপনে থেকেও হাছান মাহমুদের ভাই এরশাদ মাহমুদ ও তার শ্যালক মুহাম্মদ ফয়সাল চৌধুরী নতুন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তির মাধ্যমে ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখেছেন। ২০২৪ সালের ১ সেপ্টেম্বর ফয়সাল চৌধুরী অসুস্থতার অজুহাতে তার প্রতিষ্ঠানের পার্টনার ও আইন উপদেষ্টাকে বালু ব্যবসার দায়িত্ব হস্তান্তর করেন। এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে পুরনো প্রভাব ও বাণিজ্যিক স্বার্থ আজও টিকে রয়েছে বলে দাবি করেছেন স্থানীয়রা।
রাঙ্গুনিয়া উপজেলা প্রশাসনের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বণিক বার্তাকে জানান, “হাছান মাহমুদের পরিবারের অর্থবিত্তের মূল উৎস ছিল বালু ব্যবসা। সরকার পরিবর্তনের পর তারা আত্মগোপনে গেলেও ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে ভিন্ন নামে এবং কৌশলে নতুন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে।” তার মতে, প্রশাসনিক দুর্বলতাও এসব অপতৎপরতা রোধে ব্যর্থতার অন্যতম কারণ।
অপরিকল্পিত বালি উত্তোলনের ফলে এলাকাভিত্তিক নানা অবকাঠামো যেমন গোডাউন ও বগাবিলি সেতু ঝুঁকির মুখে পড়লেও প্রশাসনের পক্ষ থেকে উল্লেখযোগ্য কোনো পদক্ষেপ নিতে দেখা যায়নি। নিয়ম অনুযায়ী, বাংলা বর্ষের ১ বৈশাখ থেকে ৩০ চৈত্র পর্যন্ত নির্ধারিত পরিমাণে বালি উত্তোলনের অনুমতি থাকলেও ইজারাপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানগুলো প্রতি মাসেই এক বছরের বালি তুলছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
উল্লেখযোগ্যভাবে, ২০২৪ সালের ৩০ এপ্রিল পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রকল্প থেকে উত্তোলিত অতিরিক্ত ১ কোটি ৩০ লাখ ৫০ হাজার ৮৯০ ঘনফুট বালি মাত্র ৩০ পয়সা হারে সংগ্রহ করে মেসার্স ফয়সাল ব্রাদার্স ও নঈমীয়া এন্টারপ্রাইজ। প্রতিষ্ঠান দুটি এরশাদ মাহমুদের শ্যালক মুহাম্মদ ফয়সালের মালিকানাধীন। কোনো দরপত্র আহ্বান ছাড়াই ‘রাঙ্গুনিয়া ড্রেজিং ও ড্রেজড মেটেরিয়াল ব্যবস্থাপনা কমিটি’র সভায় সর্বসম্মতিক্রমে এই বালি তাদের দেয়া হয়। এতে বোঝা যায়, এক যুগের বেশি সময় ধরে রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় পরিবারটি স্থানীয় নদী ও খালের বালু ব্যবসা থেকে অস্বাভাবিক মুনাফা করেছে। বর্তমানে স্থানীয় বিএনপি নেতাদের সঙ্গে যোগসাজশে ব্যবসায়িক আধিপত্য টিকিয়ে রাখার কৌশল অবলম্বন করছে বলেও দাবি করেন স্থানীয়রা।
চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, রাঙ্গুনিয়ার বিভিন্ন বালুমহালে ১৪৩২ বাংলা সনের জন্য নতুন দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। ইছামতী-২ বালুমহালের বালির সম্ভাব্য মূল্য প্রতি ঘনফুট ৩ টাকা ২০ পয়সা, ইছামতী-৩ এ ২ টাকা ৪২ পয়সা, ইছামতী-৪ এ ২ টাকা ৫ পয়সা, শিলক খালে ৫ টাকা ৩৪ পয়সা, ঝংকার খালে ৩ টাকা ২৩ পয়সা, নারিশ্চা বালুমহালে ৪৭ টাকা ৩৭ পয়সা এবং ফকিরাঘাটে ৯ টাকা ৯৬ পয়সা নির্ধারণ করা হয়েছে। এসব দরপত্রের কার্যক্রম সম্পন্ন হলে দেশের সর্বোত্তম মানের বালির প্রতিযোগিতামূলক মূল্য আরো বাড়বে বলে আশা করছে জেলা প্রশাসন।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে সদ্য দায়িত্ব নেয়া রাঙ্গুনিয়া উপজেলার ইউএনও কামরুল হাসান কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তবে পূর্বতন ইউএনও মাহমুদুল হাসান বণিক বার্তাকে জানান, “রাঙ্গুনিয়ার বালুমহাল ঘিরে দীর্ঘদিন ধরেই সংকট ও রাজনৈতিক টানাপড়েন ছিল। দরপত্রের শর্ত ভঙ্গ যেন একটি সাধারণ নিয়মে পরিণত হয়েছিল। দায়িত্ব নেয়ার পর আমি ইজারা বহির্ভূত প্রায় ৩ কোটি টাকার বালি উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে বিক্রি করেছি।” তার মতে, প্রশাসনিক নজরদারি এবং নিয়মতান্ত্রিক ইজারা প্রক্রিয়া নিশ্চিত হলে একদিকে সরকারের রাজস্ব আয় বাড়বে অন্যদিকে পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাব কমে আসবে।

