দেশব্যাপী নারী ও কন্যাশিশু নির্যাতনের ঘটনা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েই চলেছে। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ ও মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, ২০২৫ সালের প্রথম তিন মাসে—জানুয়ারি, ফেব্রুয়ারি ও মার্চে মোট ৮৩৬ জন নারী ও কন্যাশিশু বিভিন্ন ধরনের নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ২৬০ জন। শুধু মার্চ মাসেই নির্যাতনের শিকার হয়েছেন ৪৪২ জন, যা জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারির সম্মিলিত সংখ্যার চেয়েও বেশি। ওই দুই মাসে নির্যাতনের সংখ্যা ছিল যথাক্রমে ২০৫ ও ১৮৯ জন।
বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের কেন্দ্রীয় লিগ্যাল এইড উপপরিষদের তথ্য অনুযায়ী, মার্চ মাসে নির্যাতনের শিকার ২৪৮ জন কন্যাশিশু ও ১৯৪ জন নারীকে নিয়ে সর্বমোট ৪৪২ জন নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ১২৫ জন শিশুসহ ১৬৩ জন। সবচেয়ে আতঙ্কজনক তথ্য হলো, ওই মাসেই ১৮ শিশুসহ ৩৬ জন নারী ও শিশু দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। এমনকি ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ২ জন শিশুকে, এবং ধর্ষণের কারণে আত্মহত্যা করেছেন আরও দুজন।
এর আগের মাস ফেব্রুয়ারিতে নির্যাতনের শিকার হন ১৮৯ জন নারী ও শিশু। তাদের মধ্যে ধর্ষণের শিকার হন ৩০ শিশুসহ ৪৮ জন। দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হন ১১ জন, যার মধ্যে তিনজন শিশু। এছাড়া ওই মাসে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয় এক শিশুকে এবং ধর্ষণের চেষ্টার শিকার হন চার শিশু ও এক নারী।
জানুয়ারি মাসেও একই ধারা অব্যাহত ছিল। ওই মাসে নির্যাতনের শিকার হন ২০৫ নারী ও কন্যাশিশু, যার মধ্যে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ৩৩ শিশুসহ ৪৯ জন। ১৪ শিশুসহ ২০ জন দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়েছেন, ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে এক শিশুসহ দুজনকে। এছাড়া ধর্ষণের চেষ্টার শিকার হয়েছেন আরও দুজন।
মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের মার্চ মাসের প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, দেশে শিশু ও নারী নির্যাতন, বিশেষ করে ধর্ষণের ঘটনা ভয়াবহভাবে বেড়েছে। নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা রোধে যথেষ্ট আইনগত কাঠামো থাকলেও আইন প্রয়োগকারী সংস্থার নিষ্ক্রিয়তা, বিচারপ্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতি অপরাধীদের আরও বেপরোয়া করে তুলছে। ফলে নারী ও শিশুদের নিরাপত্তা প্রশ্নে জনমনে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদন ও নিজস্ব অনুসন্ধানের ভিত্তিতে তারা প্রতিবছর মাসিক মানবাধিকার প্রতিবেদন তৈরি করে। তাদের হিসাবে, মার্চে দেশে ১৩২টি ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে, যা ফেব্রুয়ারির ৫৭টির তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি। একইসঙ্গে মার্চে দলবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনা ছিল ২৫টি, যেখানে ফেব্রুয়ারিতে এ সংখ্যা ছিল ১৭টি। ধর্ষণচেষ্টার ঘটনাও মার্চে বেড়ে দাঁড়ায় ৬১টিতে, যা ফেব্রুয়ারিতে ছিল ১৯টি।
এই ভয়াবহ পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি ডা. ফওজিয়া মোসলেম বলেন, মাগুরায় শিশু আছিয়ার নির্মম মৃত্যুর পর জনগণের আন্দোলন জোরদার হলেও নারীর প্রতি সহিংসতা ও বিদ্বেষ কমেনি। বরং সমাজে নারীকে প্রকাশ্যে অপমান, অপদস্থ করার প্রবণতা বেড়েছে। তার মতে, দেশে ‘মব’ সহিংসতার প্রবণতাও উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, অপরাধীর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দ্রুত নিশ্চিত করতে হবে। আইন যতই কঠোর হোক না কেন, বিচারপ্রার্থী নারীর পথের বাধাগুলো দূর না হলে বাস্তবে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।
সামগ্রিকভাবে দেখা যাচ্ছে, দেশে নারী ও কন্যাশিশুদের নিরাপত্তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ বিরাজ করছে। অপরাধ বাড়লেও বিচার না পাওয়ার প্রবণতা অপরাধীদের সাহসী করে তুলছে। এখন প্রয়োজন আইন ও বিচার ব্যবস্থার সংস্কার, দ্রুত বিচার নিশ্চিতকরণ এবং নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে কার্যকর ও জবাবদিহিমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ। না হলে নারী ও শিশুদের প্রতি এই সহিংসতার গ্রাফ থামানো যাবে না—বরং এটি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করবে যা সামগ্রিকভাবে সমাজের শান্তি ও স্থিতিশীলতার জন্য হুমকিস্বরূপ।

