তৃণমূল পর্যায়ে খেলাধুলার প্রসারে গঠিত হয়েছিল ক্রীড়া পরিদপ্তর। উদ্দেশ্য ছিল তরুণদের খেলাধুলার মাধ্যমে গড়ে তোলা। অথচ বছর বছর এই প্রতিষ্ঠানেই চলেছে লুটপাট। প্রকল্পের টাকা আত্মসাৎ, ভুয়া ভাউচার, অনুমতি ছাড়াই বিল উত্তোলন, অচল গাড়ির নামে তেল খরচ—এমন নানা দুর্নীতির অভিযোগে নড়েচড়ে বসেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
প্রাথমিক তদন্তে ৩২ জনের বিরুদ্ধে প্রমাণ মিলেছে। তাদের জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ডাকা হচ্ছে দুদকে।
তদন্তে উঠে এসেছে, রাজধানীর ক্রীড়া পরিদপ্তরের প্রধান কার্যালয় থেকেই এই সিন্ডিকেট পরিচালিত হতো। নেতৃত্বে ছিলেন সাবেক উপপরিচালক এসআইএম ফেরদৌউস আলম, সহকারী পরিচালক আলীমুজ্জামান ও আজিম হোসেন। গোটা প্রতিষ্ঠান কার্যত ছিল তাদের নিয়ন্ত্রণে।
৪ মে দুদক তলব করে সহকারী পরিচালক আজিম হোসেন, প্রধান সহকারী হাসান তারেক, কম্পিউটার অপারেটর ফিরোজ হাসান, অফিস সহকারী নাছির উদ্দীন এবং গাড়িচালক আমির হোসেনকে। পরদিন আরও ১৮ জনকে তলব করে সংস্থাটি।
দুদকের এক কর্মকর্তা জানান, ভুয়া ভাউচার, একই ভাউচার একাধিকবার ব্যবহার, অনুমতি ছাড়া টাকা তোলা এবং নিয়োগ বাণিজ্যের মতো অভিযোগে তদন্ত চলছে। ৩০ জনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ডাকা হয়েছে। প্রমাণ মিললে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
দুদকে জমা দেওয়া নথিপত্রে দেখা যায়, ২০২২-২৩ অর্থবছরে বিপুল সংখ্যক বিল (যেমন: নং ৫৭ থেকে শুরু করে ১৮২ পর্যন্ত) অফিস প্রধানের অনুমোদন ছাড়াই তোলা হয়েছে। এমনকি ২০২৩-২৪ অর্থবছরের জুলাই-নভেম্বর সময়েও একই কৌশলে বিল তোলা হয়েছে।
এ সময়ের মধ্যে ১১ কোটি ৪৮ লাখ টাকার ক্রীড়া সামগ্রী কেনার বিলও উত্তোলন করা হয়েছে অনুমোদন ছাড়াই। এই বিল অনুমোদন করেছিলেন ফেরদৌউস আলম, আলীমুজ্জামান, আজিম হোসেন ও স্টোর ইনচার্জ ফিরোজ হাসান।
তদন্তে আরও উঠে এসেছে, আলীমুজ্জামান প্রতি মাসে দেশের ৫৫ জেলার ক্রীড়া কর্মকর্তাদের কাছ থেকে মাসোহারা নিতেন। ১০ হাজার থেকে এক লাখ টাকা পর্যন্ত টাকা জমা হতো তার ব্যক্তিগত ব্যাংক অ্যাকাউন্টে। ব্যাংক স্টেটমেন্টেই রয়েছে সেই প্রমাণ।
গত ১৫ বছরে তারা নিম্নমানের ক্রীড়া সামগ্রী কিনে রাষ্ট্রীয় অর্থে চরম অপচয় করেছে। টেন্ডারে শর্ত এমনভাবে তৈরি করা হতো, যাতে নির্দিষ্ট কিছু প্রতিষ্ঠান ছাড়া কেউ অংশ নিতে না পারে। ক্ল্যাসিক স্পোর্টস ও আরও কয়েকটি ঘনিষ্ঠ প্রতিষ্ঠান এ সুবিধা পেত।
২০২১ সালের বঙ্গবন্ধু ও বঙ্গমাতা গোল্ডকাপে ১০ কোটি টাকা বরাদ্দ ছিল। কিন্তু উপপরিচালক আক্তারুজ্জামান রেজা ৯৫ লাখ টাকা ব্যয় করলেও মাত্র ৬০ লাখ টাকার ভাউচার দাখিল করেন। এর মধ্যে ২২ লাখ টাকার ভাউচার আবার দাখিল করেন ফেরদৌউস আলমও। বাকি ৩৫ লাখ টাকার কোনো হিসাবই নেই। উদ্বোধনের আগেই ‘আপ্যায়ন খাতে’ ২০ লাখ টাকার খরচ দেখিয়ে টাকা তোলা হয়, যারও কোনো ভাউচার জমা নেই।
ফেরদৌউস আলম রংপুরে জেলা ক্রীড়া অফিসার থাকাকালে ভুয়া মাস্টাররোল দেখিয়ে আত্মসাৎ করেন ৪৯ লাখ টাকা। আর মো. জাহাঙ্গীর হোসেন ১২ লাখ টাকার টিএ/ডিএ আত্মসাৎ করেন একইভাবে।
সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের পক্ষেও দুর্নীতির প্রমাণ মিলেছে। বিজনেস ওয়ার্ল্ড ও ইনোভেটিভ স্পোর্টস মিডিয়ার মালিকদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ জমা হয়েছে দুদকে। বিজনেস ওয়ার্ল্ডের নামে ছয়টি চেকের মাধ্যমে তোলা হয়েছে ৩৪ লাখ টাকার বেশি।
৩২ জন অভিযুক্তের তালিকায় রয়েছেন পরিচালক ইকবাল হোসেন, উপপরিচালক আক্তারুজ্জামান রেজা, সহকারী পরিচালক আলীমুজ্জামান, ফেরদৌউস আলম ও আজিম হোসেন, প্রধান সহকারী হাসান তারেক, পিএ টু ডিরেক্টর নাসির উদ্দিন, জেলা ক্রীড়া কর্মকর্তা জাহাঙ্গীর হোসেন, গাড়িচালক জাহিদুল ইসলাম, রবিউল করিম, অফিস সহকারী তাজুল ইসলাম, মহসিন মিয়া, হাবিবুর রহমান, মহিউদ্দিন, রুবেল, প্রভাষক আব্দুল বারী, সালাউদ্দিন খান, আফরোজা বেগম, মাহাবুবুর রহমান, জহির উদ্দিন বাবরসহ আরও অনেকে।
সরকারি এই প্রতিষ্ঠানে এত বছর ধরে কীভাবে এমন দুর্নীতি চলেছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে সর্বমহলে। দুদক বলছে, তদন্তে সিন্ডিকেটের শিকড় কত গভীরে, তা উন্মোচিত হবে। প্রমাণ মিললে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।

