ক্রিকেটারদের অংশগ্রহণ, জমজমাট দর্শক উপস্থিতি এবং বিপুল প্রচারণার কারণে টুর্নামেন্টটি আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও পরিচিতি পেয়েছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নানা বিতর্ক, অব্যবস্থাপনা এবং পারিশ্রমিক সংকটের কারণে বিপিএলের ভাবমূর্তি প্রশ্নের মুখে পড়েছে।
সেই বাস্তবতারই প্রতিফলন দেখা গেল বিশ্ব ক্রিকেটার্স অ্যাসোসিয়েশনের সর্বশেষ মূল্যায়নে। বিশ্বের প্রধান টি-টোয়েন্টি ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগগুলোর মধ্যে বিপিএল পেয়েছে ১০০-এর মধ্যে মাত্র ২২ দশমিক ৬ নম্বর, যা তালিকাভুক্ত ১০টি লিগের মধ্যে সর্বনিম্ন।
শীর্ষে ‘দ্য হান্ড্রেড’, তলানিতে বিপিএল
বিশ্ব ক্রিকেটার্স অ্যাসোসিয়েশন খেলোয়াড়, এজেন্ট এবং বিভিন্ন দেশের ক্রিকেটার্স সংগঠনের মতামতের ভিত্তিতে এই মূল্যায়ন প্রকাশ করেছে।
র্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষে রয়েছে ইংল্যান্ডের দ্য হান্ড্রেড, যারা পেয়েছে ৭৫ দশমিক ২ নম্বর। দ্বিতীয় স্থানে দক্ষিণ আফ্রিকার এসএ২০, তাদের স্কোর ৬৮। অন্যদিকে বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় ফ্র্যাঞ্চাইজি টুর্নামেন্ট আইপিএল পেয়েছে ৬২ দশমিক ৬ নম্বর, যা তাকে তৃতীয় স্থানে রেখেছে।
আর এই তালিকার একেবারে নিচে অবস্থান করছে বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগ।
কেন এত খারাপ অবস্থানে বিপিএল?
বিশ্ব ক্রিকেটার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি লিসা স্টালেকার মনে করেন, বিপিএলের সবচেয়ে বড় সমস্যা শুধু প্রতিযোগিতার মান নয়, বরং প্রশাসনিক দুর্বলতা এবং পারিশ্রমিক সংক্রান্ত অনিশ্চয়তা।
তার মতে, একজন পেশাদার ক্রিকেটার যখন চুক্তি অনুযায়ী মাঠে নিজের দায়িত্ব পালন করেন, তখন সময়মতো তার প্রাপ্য পারিশ্রমিক পাওয়ার নিশ্চয়তা থাকা উচিত। কিন্তু বিপিএলের ক্ষেত্রে সেই নিশ্চয়তা বারবার প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, বিদেশি ক্রিকেটারদের আকৃষ্ট করতে হলে শুধু বড় নাম আনা যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন একটি বিশ্বাসযোগ্য ও পেশাদার কাঠামো, যেখানে চুক্তি, অর্থ পরিশোধ এবং টুর্নামেন্ট পরিচালনা সবকিছুই স্বচ্ছভাবে পরিচালিত হবে।
দীর্ঘদিনের পুরোনো সমস্যা
বিপিএলের দুর্বল রেটিং হঠাৎ করে আসেনি। গত কয়েক বছর ধরেই পারিশ্রমিক নিয়ে একের পর এক বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
অনেক ফ্র্যাঞ্চাইজি বড় অঙ্কের চুক্তি করলেও পরে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে অর্থ পরিশোধ করতে ব্যর্থ হয়েছে। এর ফলে স্থানীয় ও বিদেশি ক্রিকেটারদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে।
২০২৫ সালে পারিশ্রমিক না পাওয়ার অভিযোগে একটি দল অনুশীলন বয়কট পর্যন্ত করেছিল। বিভিন্ন ফ্র্যাঞ্চাইজিকে ঘিরে আর্থিক অনিয়ম, বকেয়া বেতন এবং চুক্তি লঙ্ঘনের অভিযোগও সামনে এসেছে। সর্বশেষ আসরেও কয়েকটি দলকে কেন্দ্র করে একই ধরনের আলোচনা হয়েছে।
আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে কী বার্তা দিল এই র্যাঙ্কিং?
বিশ্লেষকদের মতে, এই র্যাঙ্কিং শুধু একটি সংখ্যা নয়; এটি বাংলাদেশের ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেটের বর্তমান বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি।
যখন বিশ্বের অন্যান্য লিগ উন্নত সম্প্রচার, আধুনিক ব্যবস্থাপনা, শক্তিশালী বাণিজ্যিক কাঠামো এবং ক্রিকেটারবান্ধব নীতির মাধ্যমে নিজেদের অবস্থান শক্ত করছে, তখন বিপিএল এখনো মৌলিক কিছু সমস্যা কাটিয়ে উঠতে পারেনি।
এর ফলে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটারদের কাছে টুর্নামেন্টটির আকর্ষণ কমছে, স্পনসরদের আস্থাও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।
সামনে কী চ্যালেঞ্জ?
বিপিএলকে আবারও প্রতিযোগিতামূলক ও আন্তর্জাতিক মানের টুর্নামেন্ট হিসেবে গড়ে তুলতে হলে শুধু মাঠের ক্রিকেট নয়, মাঠের বাইরের ব্যবস্থাপনাকেও আমূল পরিবর্তন করতে হবে।
সময়ের মধ্যে পারিশ্রমিক পরিশোধ, শক্তিশালী ফ্র্যাঞ্চাইজি কাঠামো, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা এবং পেশাদার পরিচালনাই হতে পারে এই সংকট থেকে উত্তরণের পথ।
নচেৎ বিশ্বের অন্যান্য ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগ যখন এগিয়ে যাবে, তখন বিপিএল আরও পিছিয়ে পড়ার ঝুঁকিতে থাকবে। বর্তমানে ১০০-এর মধ্যে ২২ দশমিক ৬ নম্বর পাওয়ার এই বাস্তবতা সেই সতর্কবার্তাই স্পষ্টভাবে সামনে এনে দিয়েছে।

