বাংলাদেশের অন্যতম ভোগ্যপণ্য আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান রাজশাহীভিত্তিক নাবিল গ্রুপ ও এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক আমিনুল ইসলাম স্বপনের বিরুদ্ধে ইসলামী ব্যাংক থেকে প্রায় ১৩ হাজার ৬৪৫ কোটি টাকা ঋণ গ্রহণ এবং এর পেছনে ভয়াবহ অনিয়ম ও জালিয়াতির অভিযোগ উঠেছে। বিষয়টি নিয়ে তদন্ত করছে বাংলাদেশ ব্যাংক, বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ), দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ও সিআইডি।
তদন্তে উঠে এসেছে, নাবিল গ্রুপ অভিনব কৌশলে অর্থ জালিয়াতির ফাঁদ পেতেছে। সাধারণত ঋণ পাওয়ার জন্য প্রথমে জামানত জমা দিতে হয়, তারপর ব্যাংক ঋণ অনুমোদন করে। কিন্তু নাবিল গ্রুপের ক্ষেত্রে উল্টো প্রক্রিয়ায় কাজ হয়েছে — আগে ঋণ নেওয়া হয়েছে, তারপর সেই ঋণের অর্থ দিয়েই এফডিআর (ফিক্সড ডিপোজিট রসিদ) খুলে তা জামানত হিসেবে দেখানো হয়েছে। খেলাপি হলে ওই এফডিআর ভেঙে আবার ডাউন পেমেন্ট দেখিয়ে ঋণ নবায়ন করা হয়েছে।
এই প্রক্রিয়ায় ব্যাংকের অসাধু কর্মকর্তারাও সক্রিয়ভাবে সহযোগিতা করেছেন। ঋণের বিপরীতে জমা রাখা জামানতের প্রকৃত মূল্য ছিল খুবই নগণ্য, যা ঋণের ঝুঁকি বহন করার মতো নয়। ঋণের টাকায় প্রায় ১ হাজার একর জমি কিনেছে নাবিল গ্রুপ, যা বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালার সম্পূর্ণ পরিপন্থী।
২০২২ সালের মার্চের পর থেকে হঠাৎ করেই নাবিল গ্রুপের ঋণগ্রহণ অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়। ইসলামী ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, শুধু তাদের ব্যাংকের রাজশাহী শাখায় বর্তমানে নাবিল গ্রুপের ঋণের পরিমাণ ২ হাজার ৪৬৩ কোটি টাকা। একইসঙ্গে গ্রুপ চেয়ারম্যান জাহান বক্সের নামে নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠান এ জে ট্রেড ইন্টারন্যাশনালের নামে ঋণের পরিমাণ ১ হাজার ৬১৭ কোটি টাকা, যা বর্তমানে সাবস্ট্যান্ডার্ড ও সন্দেহজনক শ্রেণিতে পড়েছে।
ইসলামী ব্যাংক কোম্পানি আইনের ২৬ ধারায় বলা আছে, একটি ব্যাংক তার মূলধনের সর্বোচ্চ ২৫ শতাংশ পর্যন্ত ঋণ দিতে পারে কোনো একক গ্রাহক বা গ্রুপকে, তার মধ্যে সরাসরি (ফান্ডেড) ঋণের সীমা ১৫ শতাংশ। অথচ ইসলামী ব্যাংক মূলধন ঘাটতির মধ্যেও নাবিল গ্রুপকে পাঁচ গুণ বেশি ঋণ দিয়েছে।
তদন্তে আরও জানা গেছে, ইসলামী ব্যাংকের মাধ্যমে খোলা ৯টি বেনামি কোম্পানির নামে মোট ৯ হাজার ৫৬৫ কোটি টাকা ঋণ নেওয়া হয়েছে, যার প্রকৃত সুবিধাভোগী নাবিল গ্রুপ। এই কোম্পানিগুলোর মালিকানা গ্রুপের কর্মচারীদের নামে, যারা মাসিক বেতনভুক্ত। অথচ এসব কোম্পানির নাম নাবিল গ্রুপের ওয়েবসাইটেও নেই, যা স্বচ্ছতা নিয়ে বড় প্রশ্ন তোলে।
এই অর্থ কয়েক হাত ঘুরে এস আলম গ্রুপের বিভিন্ন হিসাবেও গেছে বলে অভিযোগ আছে, যা পরবর্তীতে বিদেশে পাচার হয়েছে।
২০২৫ সালের ২৪ মার্চ দুদকের আবেদনের ভিত্তিতে রাজশাহীর পবা উপজেলায় আমিনুল ইসলাম, তার স্ত্রী ইসরাত জাহান এবং তাদের মালিকানাধীন ৪টি প্রতিষ্ঠানের ১৭৮ বিঘা জমি জব্দের নির্দেশ দেন আদালত। এর মধ্যে আমিনুল ইসলামের নামে ১৩২ বিঘা, স্ত্রীর নামে ২৩ বিঘা এবং বিভিন্ন কোম্পানির নামে বাকি জমি রয়েছে।
এছাড়া বিএফআইইউ গত সেপ্টেম্বরে আমিনুল ইসলাম, তার স্ত্রী, বাবা-মা ও সন্তানদের ব্যক্তিগত ব্যাংক হিসাব জব্দ করে। যদিও প্রতিষ্ঠানগুলোর হিসাব চলমান রয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি একধরনের “পনজি স্কিম” কৌশল, যেখানে নতুন ঋণের অর্থ দিয়ে পুরোনো ঋণের কিস্তি শোধ করা হচ্ছে। একসময় বেক্সিমকোর সালমান এফ রহমান এই কৌশল ব্যবহার করে সমালোচিত হন। এবার তারই পুনরাবৃত্তি ঘটেছে আমিনুল ইসলাম স্বপনের মাধ্যমে।
২০২৪ সালে সরকার পরিবর্তনের পরও নাবিল গ্রুপ ইসলামী ব্যাংক থেকে নতুন করে ৮০০ কোটি টাকা ঋণ গ্রহণ করেছে, যা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নজর এড়িয়ে গেছে।
বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার শেখ হাসিনার পরিবার ও ১০টি শীর্ষ ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ব্যাংক জালিয়াতি ও অর্থ পাচারের অভিযোগ তদন্তে ১১টি যৌথ কমিটি গঠন করেছে। এর মধ্যে অন্যতম সন্দেহভাজন নাবিল গ্রুপ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান জানিয়েছেন, ইসলামী ব্যাংকে ফরেনসিক অডিটের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। যেখানে যত অনিয়ম হয়েছে, গুরুত্ব বিবেচনায় তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কোনো ব্যাংক ছাড় পাবে না।
নাবিল গ্রুপের এই ঋণ কেলেঙ্কারি বাংলাদেশের ব্যাংক খাতে বিদ্যমান দুর্বলতা, রাজনৈতিক প্রভাব, জবাবদিহির অভাব এবং জটিল বেনামি লেনদেনের ভয়াবহ বাস্তবতা তুলে ধরছে। যখন দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সংকট, ডলার বাজারের অস্থিরতা, এবং আমদানি নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজনীয়তা চরমে — তখন একটি একক গ্রুপের পেছনে হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয় হওয়া দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর বড় হুমকি তৈরি করছে।

