বাংলাদেশে দলবদ্ধভাবে বিশৃঙ্খলা বা মব সৃষ্টি করে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা ক্রমেই বাড়ছে। গত ১০ মাসে মব সন্ত্রাস ও গণপিটুনির ঘটনায় সারাদেশে ১৭৪ জন নিহত হয়েছেন, যার মধ্যে চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে সোমবার পর্যন্ত ৮৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) এই তথ্য প্রকাশ করেছে।
মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশন (এমএসএফ) এর তথ্য অনুযায়ী, গত ৮ মাসে এ ধরনের ঘটনায় কমপক্ষে ১৫০ জন নিহত এবং ৩৬৩ জন আহত হয়েছেন। ২০২৩ সালে এমএসএফের হিসাবে ১৪৩টি ঘটনায় ৮৬ জন প্রাণ হারিয়েছেন।
মানবাধিকারকর্মীরা জানিয়েছেন, মব সন্ত্রাসের ঘটনা বাড়লেও জড়িতদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। সরকার ও সেনাবাহিনী থেকে একাধিকবার কঠোর হুঁশিয়ারি দেওয়া হলেও- এই প্রবণতা থামছে না। এমনকি পুলিশ সদস্যরাও মবের শিকার হচ্ছেন। গত ১০ মাসে পুলিশের ওপর হামলার ঘটনায় ৪৭৭টি মামলা দায়ের হয়েছে, যার মধ্যে ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৫ সালের মে পর্যন্ত বিভিন্ন মাসে মামলার সংখ্যা বেড়েছে।
সর্বশেষ উত্তরায় সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার কে এম নূরুল হুদার বাসায় মবের ঘটনায় পুলিশ কয়েকজনকে শনাক্ত করলেও- সোমবার সন্ধ্যা পর্যন্ত কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়নি। এ ঘটনায় বিএনপির স্বেচ্ছাসেবক দলের কিছু নেতাকর্মীর জড়িত থাকার অভিযোগ উঠেছে। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেছেন, দলের কেউ জড়িত থাকলে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস গত বছরের ১১ সেপ্টেম্বর জাতির উদ্দেশে বলেছিলেন, কেউ আইন নিজের হাতে তুলে নিলে তাকে শাস্তির আওতায় আনা হবে। কিন্তু মানবাধিকারকর্মী নূর খান লিটন জানান, ৫ আগস্টের পর মানুষের প্রত্যাশা ছিল ন্যায়বিচার ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশ কিন্তু এখনও মব সন্ত্রাস বন্ধে দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেই।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বলেন, পুলিশের উপস্থিতিতে মবের ঘটনা ঘটলে আইনের শাসন প্রশ্নবিদ্ধ হয়। এই ঘটনাগুলো পরিকল্পিত বলে মনে হচ্ছে এবং এটি দমন না করলে যে কেউ এর শিকার হতে পারে।
মানবাধিকার সংগঠন আসক ও হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস) জানিয়েছে, মব সন্ত্রাস মানবাধিকার লঙ্ঘনের গুরুতর দৃষ্টান্ত এবং এটি দেশের আইনি ও গণতান্ত্রিক কাঠামোর জন্য হুমকি। তারা জড়িতদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনার জন্য সরকার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতি আহ্বান জানিয়েছে।
মব সন্ত্রাসের ক্রমবর্ধমান ঘটনা বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির ইঙ্গিত দেয়। সরকারের ঘোষণা ও হুঁশিয়ারি সত্ত্বেও কার্যকর পদক্ষেপের অভাবে এই সংকট আরো গভীর হচ্ছে। জড়িতদের দ্রুত চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনা এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধি না করলে এই নৈরাজ্য চলতে থাকবে।

