দেশ যখন লড়ছিল প্রাণ বাঁচানোর লড়াইয়ে, তখন স্বাস্থ্যখাতের শীর্ষ নেতৃত্বে চলছিল দুর্নীতির উৎসব। সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক ও তাঁর ছেলে রাহাত মালেক শুভ্র-কে ঘিরে গড়ে ওঠা একাধিক দুর্নীতির চিত্র এখন প্রকাশ্যে।
দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অনুসন্ধানে উঠে এসেছে—বিদেশে টাকা পাচার, ব্যাঙ্কে সন্দেহজনক লেনদেন, জমির পাহাড়, স্বাস্থ্যখাতে কমিশন বাণিজ্য, কালো তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেওয়া—সবই ঘটেছে একটি সংঘবদ্ধ চক্রের ছায়ায়।
বিদেশে পাচার অন্তত ১ হাজার কোটি টাকা
দুদকের করা মামলায় বলা হয়, জাহিদ মালেক জ্ঞাত আয়ের বাইরে ৬১ কোটি ৪২ লাখ টাকার সম্পদের মালিক হয়েছেন। পাশাপাশি ৩৪টি ব্যাংক হিসাবে ১৪৩ কোটি টাকার সন্দেহজনক লেনদেন করেছেন।
ছেলে রাহাত মালেক শুভ্রর বিরুদ্ধেও রয়েছে ১১ কোটি ৮৪ লাখ টাকার অপ্রদর্শিত সম্পদ এবং ৫১টি ব্যাংক হিসাবে ৬৬৩ কোটি টাকার লেনদেনের তথ্য। অভিযোগ, এসব অর্থ সরকারি ক্ষমতার অপব্যবহার, স্বাস্থ্য প্রকল্পে কমিশন এবং দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত।
জমি কিনেছেন ছয় হাজার শতাংশের বেশি
দুদক জানিয়েছে, মানিকগঞ্জ জেলার বিভিন্ন এলাকায় জাহিদ মালেক ও তাঁর পরিবারের নামে ৬,০৫৩ শতাংশ জমি কেনা হয়েছে। এর মধ্যে:
- জাহিদ মালেকের নামে: ২১৯৩ শতাংশ
- রাহাত মালেকের নামে: ১৭৪২ শতাংশ
- মেয়ে সিনথিয়া মালেকের নামে: ১১১৮ শতাংশ
এই জমির বাজারমূল্য হাজার কোটি টাকার বেশি বলেই ধারণা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের।
স্বাস্থ্যখাতে দুর্নীতির চিত্র ভয়াবহ
স্বাস্থ্য খাত সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়, কভিড-১৯ চলাকালে বিভিন্ন হাসপাতালে সুরক্ষা সরঞ্জামের দাম ৩০০% পর্যন্ত বাড়িয়ে কেনা হয়। নির্মাণ খাতে হয়েছে বাজেট লোপাট।
কমিশনের মতে, মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ পর্যায়ে রাজনৈতিক প্রভাবশালীরা বাজেট ও প্রকল্প নিয়ন্ত্রণ করতেন। অপ্রয়োজনীয় ভবন, নিম্নমানের যন্ত্রপাতি এবং মনগড়া চাহিদা তৈরি করে বাজেট থেকে ভাগ বসানো হয়েছে।
টিআইবি এবং এডিবির গবেষণাতেও এই চিত্র উঠে এসেছে। শুধু উন্নয়ন নয়, বেসরকারি হাসপাতাল- ক্লিনিকের লাইসেন্স দিতেও হয়েছে অঘোষিত লেনদেন।
কমিশন না দিলে কাজ মেলেনি
দুদকের অনুসন্ধানে উঠে আসে আরেক ভয়াবহ তথ্য—স্বাস্থ্যখাতের প্রকল্পে কাজ পেতে ঠিকাদারদের দিতে হয়েছে ১০–২৫% কমিশন। এই কমিশনের বড় অংশ যেত রাহাত মালেক শুভ্র ও তাঁর ঘনিষ্ঠ ডা. মাজহারুল হক তপন–এর সিন্ডিকেটের হাতে।
২০২১ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত সময়কালে ৩১৮ কোটি টাকার বেশি চিকিৎসা যন্ত্র কেনা হয়। ঘুরেফিরে মাত্র ২৪টি প্রতিষ্ঠান এই কাজগুলো পায়। অভিযোগ, কমিশন ছাড়া কেউই কাজ পায়নি।
কালো তালিকাভুক্ত ঠিকাদাররাও পেয়েছে কাজ
দুদক সূত্রে জানা যায়, দুর্নীতির অভিযোগে কালো তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলো নতুন নামে কাজ করেছে।
প্রভাবশালী ঠিকাদার মোতাজ্জেরুল ইসলাম মিঠু নিজে ও আত্মীয়দের নামে খুলেছেন ২০টির বেশি কোম্পানি।
এইসব প্রতিষ্ঠান:
- ট্রেড হাউস: ৫১ কোটি টাকা
- ওয়ান ট্রেড: ৫.৮৮ কোটি টাকা
- মাইক্রো ট্রেডার্স: ১৭.৬৪ কোটি টাকা
- বাংলাদেশ সায়েন্স হাউস: ১৭.০৭ কোটি টাকা
- টেকনোওয়ার্থ অ্যাসোসিয়েটস: ১১.৮১ কোটি টাকা
এদের মধ্যে বেশ কিছু প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে রয়েছে জালিয়াতি ও মানহীন সরবরাহের অভিযোগ।
সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত সাধারণ মানুষ
এই দুর্নীতির সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী সাধারণ জনগণ। যারা সংকটে সরকারি চিকিৎসা পাওয়ার কথা, তারা পায়নি। বরং নিজেদের পকেট থেকে খরচ করে সেবা নিতে বাধ্য হয়েছে।
আইসিডিডিআরবির গবেষক আহমদ এহসানুর রহমান বলেন,
“স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ কম, তার ওপর যদি দক্ষতার অভাব ও দুর্নীতি চলে—তবে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয় দরিদ্র ও প্রান্তিক মানুষ।”
দুর্নীতি ছিল কাঠামোবদ্ধ, সংঘবদ্ধ ও রাজনৈতিকভাবে পৃষ্ঠপোষকতায় পরিচালিত
এই প্রতিবেদন শুধু একজন মন্ত্রীর দুর্নীতির কাহিনি নয়। এটা পুরো রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা, জবাবদিহির অভাব এবং রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় গড়ে ওঠা দুর্নীতির চিত্র।
করোনার মতো সংকটে যখন রাষ্ট্রীয় নৈতিকতা সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ছিল—ঠিক তখন সবচেয়ে বড় ধাক্কা এসেছে ভেতর থেকে। দুর্নীতি হয়েছে স্বাস্থ্যসেবা, জীবন আর মৃত্যুর মাঝখানে দাঁড়িয়ে।

