আগামী ২০২৬–২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে সরকারি ঘাটতি ঘোষিত লক্ষ্যের তুলনায় অনেক বেশি হতে পারে বলে সতর্ক করেছে গবেষণা ও নীতি সংযোজন সংস্থা র্যাপিড। সংস্থাটির মতে, বাস্তব পরিস্থিতিতে বাজেট ঘাটতি প্রায় চার লাখ কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে।
সরকারি হিসাবে প্রস্তাবিত ঘাটতির পরিমাণ ধরা হয়েছে দুই লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা, যা মোট দেশজ উৎপাদনের ৩ দশমিক ৬ শতাংশ।
র্যাপিডের সতর্কতা: রাজস্ব ও বৈদেশিক অর্থায়নে ঘাটতি:
র্যাপিড বলছে, রাজস্ব আদায় এবং বৈদেশিক অর্থায়নের উচ্চ লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করা কঠিন হবে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের অতীত প্রবণতা এবং বৈদেশিক সহায়তার প্রবাহ বিশ্লেষণ করে এই পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। সংস্থার হিসাবে, আশাবাদী পরিস্থিতিতেও রাজস্ব আয় পাঁচ লাখ কোটি টাকার নিচে থাকতে পারে। এতে প্রায় এক লাখ কোটি টাকার ঘাটতি তৈরি হতে পারে।
বৈদেশিক ঋণেও লক্ষ্য পূরণে অনিশ্চয়তা:
আগামী অর্থবছরে নিট বৈদেশিক ঋণের লক্ষ্য ধরা হয়েছে এক লাখ নয় হাজার কোটি টাকা। তবে র্যাপিডের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আবদুর রাজ্জাক বলেন, বৈশ্বিক সহায়তা কমে যাওয়ায় এতে প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকার ঘাটতি দেখা দিতে পারে। সব মিলিয়ে তার হিসাবে প্রকৃত বাজেট ঘাটতি দাঁড়াতে পারে প্রায় তিন লাখ ৯৩ হাজার কোটি টাকা, যা মোট দেশজ উৎপাদনের প্রায় ৫ দশমিক ৮ শতাংশ।
র্যাপিডের মতে, ঘাটতি পূরণে ব্যাংক ঋণের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা বেসরকারি খাতের পুনরুদ্ধারকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে। তবে ব্যয় লক্ষ্যমাত্রা পুরোপুরি বাস্তবায়িত না হলে ঘাটতি কিছুটা কমও দেখা যেতে পারে। সংস্থাটি বলেছে, বাস্তব পরিস্থিতিতে ব্যয়ের ৮০ থেকে ৮৫ শতাংশ বাস্তবায়ন হতে পারে, তবে এতে অনেক উন্নয়ন প্রতিশ্রুতি পূরণ নাও হতে পারে।
র্যাপিড চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আবদুর রাজ্জাক বলেন, বাজেটকে অবশ্যই পুনরুদ্ধারকে সহায়তা করতে হবে, তবে তা যেন সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ক্ষতিগ্রস্ত না করে। তিনি বলেন, সরকার এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির লক্ষ্যে দ্রুত প্রবৃদ্ধি অর্জনের চেষ্টা করছে। কিন্তু এই তাড়াহুড়া স্থিতিশীলতা নষ্ট করতে পারে।
তার মতে, ব্যয় বাড়িয়ে রাজস্ব সংগ্রহ ও সুশৃঙ্খল ঋণ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত না করলে মুদ্রাস্ফীতি দীর্ঘায়িত হতে পারে, বেসরকারি বিনিয়োগ কমে যেতে পারে এবং বৈদেশিক মজুদ চাপের মুখে পড়তে পারে।
বিনিয়োগ আকর্ষণে সরকারের পাঁচ উদ্যোগ:
অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, সরকার এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির লক্ষ্য সামনে রেখে বিনিয়োগ আকর্ষণে পাঁচটি বিষয়ে গুরুত্ব দিচ্ছে।
এর মধ্যে রয়েছে পাঁচ বছরের কর নীতি কাঠামো, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও দুর্নীতি কমানো, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, মুদ্রানীতি ও রাজস্ব নীতির সমন্বয় এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতা বজায় রেখে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, পাশাপাশি যোগাযোগ অবকাঠামো উন্নয়ন। তিনি আরও বলেন, অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের কারণে এবং কর সংগ্রহে ত্রুটি ও ফাঁকি কমায় আগামী বছর রাজস্ব আয় বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।
র্যাপিডের তথ্য অনুযায়ী, গত তিন বছরে দেশের মোট ঋণ ৬০ শতাংশের বেশি বেড়েছে। ২০২২ সালের জুনে মোট ঋণ ছিল ১৩ লাখ ৪৪ হাজার কোটি টাকা, যা ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২২ লাখ ছয় হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে বৈদেশিক ঋণ প্রায় দ্বিগুণ হয়ে ৯ লাখ ৫৯ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছেছে। বর্তমানে বাজেট ব্যয়ের একটি বড় অংশই সুদ পরিশোধে ব্যয় হচ্ছে। তিতুমীর বলেন, বর্তমান সরকার এই ঋণের বোঝা উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছে এবং তা ব্যবস্থাপনার চেষ্টা চলছে।
র্যাপিড বলছে, পরিবার কার্ড কর্মসূচি যদি ৪১ লাখ দরিদ্র পরিবারকে কাভার করে, তবে দারিদ্র্যের হার প্রায় ৫ শতাংশ কমে ১৩ দশমিক ৮ শতাংশে নামতে পারে। পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নে তা ১১ দশমিক ৩ শতাংশে নেমে আসতে পারে। তবে এজন্য উপভোক্তা নির্বাচন রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক প্রভাবমুক্ত হতে হবে বলে সংস্থাটি জোর দিয়েছে।
সেমিনারে ব্যবসায়ী নেতারা রপ্তানি খাত বৈচিত্র্যকরণে কর সংস্কার ও ন্যায্য প্রণোদনার দাবি জানান। এপেক্স ফুটওয়্যারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ নাসিম মঞ্জুর বলেন, নীতিগত অসঙ্গতির কারণে রপ্তানি বৈচিত্র্য বাস্তবে পিছিয়ে আছে।
তিনি শর্তসাপেক্ষ শুল্কমুক্ত আমদানি এবং ৩০ শতাংশ মূল্য সংযোজন নীতিকে অবাস্তব বলে মন্তব্য করেন। তার মতে, কিছু খাতে এই হার ১৫ শতাংশ হওয়া উচিত। তিনি আরও বলেন, লোকসানি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বেসরকারিকরণ, করপোরেট কর হ্রাস, মূল্য সংযোজন করকে দুই বা তিন স্তরে ভাগ করা এবং বাণিজ্য আলোচনার জন্য আলাদা অফিস গঠন জরুরি।
বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতির সাবেক সভাপতি রুবানা হক বলেন, অবকাঠামো উন্নয়ন হলেও দক্ষতা উন্নয়নে পিছিয়ে আছে দেশ। শিক্ষাব্যবস্থায় শিক্ষক উন্নয়নে বিনিয়োগের ঘাটতির কথাও তিনি উল্লেখ করেন। তিনি আরও বলেন, স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণের সময়টিকে সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করতে হবে। রপ্তানি বাড়াতে বড় অনলাইন বিক্রয় প্ল্যাটফর্ম তৈরির প্রস্তাবও দেন তিনি। অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন রাশেদা কে চৌধুরী এবং র্যাপিডের নির্বাহী পরিচালক এম আবু ইউসুফ।

