চট্টগ্রামের ২৫০ শয্যার জেনারেল হাসপাতালকে সরকার করোনা চিকিৎসার জন্য ডেডিকেটেড হাসপাতাল হিসেবে ঘোষণা করলেও- চিকিৎসাসেবা প্রদানে পদে পদে সংকটের মুখোমুখি হচ্ছে এই প্রতিষ্ঠান। পর্যাপ্ত শয্যা থাকলেও বেশির ভাগ চিকিৎসা সরঞ্জাম বিকল, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, মেডিক্যাল অফিসার, নার্স, মেডিক্যাল টেকনোলজিস্টসহ অন্যান্য লোকবলের তীব্র সংকট রয়েছে। ফলে করোনা রোগীদের যথাযথ চিকিৎসা প্রদান ব্যাহত হচ্ছে।
গত ২১ দিনে চট্টগ্রামে ৯০ জন করোনায় সংক্রমিত হয়েছেন, যার মধ্যে এক কিশোরসহ ছয়জন মারা গেছেন। এদের মধ্যে তিনজন চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালে, দুজন একটি বেসরকারি হাসপাতালে এবং একজন বাড়িতে মৃত্যুবরণ করেছেন। জানা গেছে, এই রোগীদের কেউ কেউ কিডনি, ক্যান্সার, হৃদরোগ, ডায়াবেটিসসহ বিভিন্ন জটিল রোগে আক্রান্ত ছিলেন। তবে চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালে কিডনি রোগীদের জন্য ডায়ালিসিস বা ক্যান্সার রোগীদের চিকিৎসার কোনো সরঞ্জাম নেই। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকেরও অভাব রয়েছে।
হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, গতকাল মঙ্গলবার (২৪ জুন) সকাল পর্যন্ত ২৫ শয্যার করোনা ওয়ার্ডে ১০ জন রোগী ভর্তি ছিলেন। এদের মধ্যে পাঁচজন সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন, তিনজন মারা গেছেন এবং দুজন এখনও চিকিৎসাধীন। পাঁচ শয্যার কভিড আইসিইউতে তিনজন রোগী ছিলেন, যার মধ্যে ক্যান্সারে আক্রান্ত একজনকে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়েছে।
হাসপাতালে ১৮ শয্যার আইসিইউ থাকলেও বেশির ভাগ যন্ত্র বিকল। করোনার জন্য প্রাথমিকভাবে পাঁচটি আইসিইউ শয্যা প্রস্তুত রাখা হয়েছে এবং রোগী বাড়লে শয্যা সংখ্যা বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। তবে চিকিৎসা সরঞ্জামের অবস্থা উদ্বেগজনক। ২৩টি ভেন্টিলেটরের মধ্যে মাত্র চারটি সচল, ৩৯টি হাই ফ্লো ন্যাজাল ক্যানুলার মধ্যে ১০টি, ২৫টি সিরিঞ্জ পাম্পের মধ্যে ১০টি, ৩৩টি বাইপেপ মেশিনের মধ্যে তিনটি এবং ১৮টি পেশেন্ট মনিটরের মধ্যে ১১টি সচল রয়েছে। দুটি পোর্টেবল এক্স-রে মেশিন, দুটি ইসিজি মেশিন এবং এমআরআই মেশিন দীর্ঘদিন ধরে বিকল। এছাড়া পাঁচটি নেবুলাইজার, চারটি স্যাকশন মেশিনসহ আরো ৬ টি চিকিৎসা যন্ত্র অচল। মোট ১৫৮টি চিকিৎসা সরঞ্জামের মধ্যে ১২০টিই বর্তমানে ব্যবহারের অযোগ্য।

লোকবলের সংকটও তীব্র। হাসপাতালের সেবা তত্ত্বাবধায়ক (মেট্রন) রাশনা দাশ জানান, “১৫৫টি পদের মধ্যে ৪৩ জন কর্মরত নেই। তিন শিফটে রোগীদের সেবা দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। করোনার সংক্রমণ বাড়ায় ডেডিকেটেড হাসপাতাল হিসেবে এখন ৪৫ জন নার্সিং কর্মকর্তা প্রয়োজন।” এই সংকট মোকাবিলায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, নার্সিং অধিদপ্তর এবং চট্টগ্রাম বিভাগীয় পরিচালকের (স্বাস্থ্য) কাছে চিঠি দিয়েছে।
হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক (ভারপ্রাপ্ত) ও কার্ডিওলজি বিভাগের সিনিয়র কনসালট্যান্ট ডা. মো. একরাম হোসেন বলেন, “চিকিৎসক-নার্সসহ অন্যান্য লোকবলের সংকট রয়েছে। চিঠি দেওয়ার পর আমরা চারজন মেডিক্যাল অফিসার পেয়েছি।” তিনি আরও জানান, “ডায়ালিসিসের সুযোগ এখানে নেই। করোনার পাশাপাশি দুরারোগ্য রোগে আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসার জন্য চমেক হাসপাতাল, বিআইটিআইডি এবং বিভাগীয় পরিচালকের সঙ্গে সমন্বয় করা হয়। কিছু চিকিৎসা যন্ত্র মেরামত করা হয়েছে, বাকিগুলোর মেরামত প্রক্রিয়াধীন। তবে করোনার রোগীরা চিকিৎসাসেবা পাচ্ছেন।”
হাসপাতালের আইসিইউ বিভাগের প্রধান জুনিয়র কনসালট্যান্ট (অ্যানেসথেসিয়া) ডা. রাজদ্বীপ বিশ্বাস বলেন, “আমরা তাৎক্ষণিকভাবে কভিডের জন্য পাঁচটি শয্যা চালু করেছি। রোগী বাড়লে শয্যা আরও বাড়ানো হবে। নন-কভিডের জন্য আইসিইউতে ১০ শয্যা আছে। আইসিইউর জন্য অনেক যন্ত্রপাতি মেরামত করতে হবে। রোগী বাড়লে এসব সরঞ্জামের প্রয়োজন হবে।”
চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালে করোনা চিকিৎসার জন্য ডেডিকেটেড ঘোষণা করা হলেও- বিকল চিকিৎসা সরঞ্জাম, লোকবলের সংকট এবং বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের অভাবে রোগীদের প্রত্যাশিত সেবা প্রদানে বাধা সৃষ্টি হচ্ছে। যন্ত্রপাতি মেরামত ও লোকবল নিয়োগের জন্য কর্তৃপক্ষের উদ্যোগ সত্ত্বেও- এই সংকট দ্রুত সমাধান না হলে করোনা রোগীদের জীবন ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তৎপরতা এই সংকট মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
