বাংলাদেশে সরকারি চাকরিজীবীদের মধ্যে ঘুষ ও দুর্নীতির প্রবণতা আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান এবং বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) নতুন জরিপে এই চিত্র উঠে এসেছে।
দুদকের তথ্য অনুযায়ী, গত ১১ মাসে করা ৩৯৯টি দুর্নীতির মামলায় মোট আসামি ১ হাজার ২৬৪ জন। এর মধ্যে ২৪৩ জনই সরকারি কর্মকর্তা, যা মোট আসামির ২৭ দশমিক ১৩ শতাংশ। এছাড়া চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত দায়ের করা ১৫৩টি মামলায় ৪৭৭ জনকে অভিযুক্ত করা হয়, যার মধ্যে সরকারি কর্মকর্তা ১৪৪ জন। অথচ ২০২৩ সালে এ সংখ্যা ছিল মাত্র ১২০।
এমন বাস্তবতায় সরকারি আরেক সংস্থা বিবিএস পরিচালিত ‘সিটিজেন পারসেপশন সার্ভে’তেও উঠে এসেছে প্রায় একই ধরনের তথ্য। দেশের ৬৪ জেলার ৮ লাখ ৩১ হাজার ৮০৭ জন নাগরিকের অভিমত নিয়ে করা এ জরিপে দেখা যায়, সরকারি সেবা গ্রহণে ঘুষ দেওয়া যেন একটি সাধারণ নিয়মে পরিণত হয়েছে। জরিপে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে যারা সরকারি কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন, তাদের প্রায় এক-তৃতীয়াংশই জানিয়েছেন, তারা ঘুষ দিতে বাধ্য হয়েছেন। সরাসরি ঘুষ দিয়েছেন ৩৩ শতাংশ, তৃতীয়পক্ষের মাধ্যমে দিয়েছেন প্রায় সমানসংখ্যক। আবার ২১ শতাংশ কর্মকর্তা ঘুরিয়ে-পেঁচিয়ে ঘুষ আদায় করেছেন।
শহর ও গ্রামের ঘুষ নেওয়ার প্রবণতায় দেখা গেছে, মফস্বলে এই চর্চা আরও বেশি। গ্রামে সরাসরি ঘুষ চেয়েছেন ৩৪ দশমিক ৭০ শতাংশ কর্মকর্তা, যেখানে শহরে এ হার ২৭ দশমিক ৭৮ শতাংশ। তবে ঘুরিয়ে বা তৃতীয়পক্ষের মাধ্যমে ঘুষ আদায়ের প্রবণতা শহরাঞ্চলে তুলনামূলক বেশি। ঘুষের ধরনেও বৈচিত্র্য রয়েছে। ৯৮ শতাংশ ক্ষেত্রে নগদ অর্থ নেওয়া হয়। তবে কেউ কেউ খাবার, পানীয়, ভ্রমণের টিকিট, হোটেল ভাড়া এমনকি জমি বা ফ্ল্যাটও নেন। জরিপে উল্লেখ আছে, দুদকের নথিতেও এমন তথ্য রয়েছে।
বিবিএসের তথ্য অনুযায়ী, বিআরটিএ, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, পাসপোর্ট অফিস এবং ভূমি অফিসে ঘুষ-দুর্নীতির হার সবচেয়ে বেশি। বিআরটিএতে সেবা নিতে গিয়ে ৬৩ শতাংশ, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীতে ৬২ শতাংশ, পাসপোর্ট অফিসে ৫৭ শতাংশ এবং ভূমি অফিসে ৫৫ শতাংশ সেবাগ্রহীতা ঘুষ দিতে বাধ্য হয়েছেন। শুধু চাওয়া নয়, অনেকেই নিজের ইচ্ছায় ঘুষ দিয়েছেন দ্রুত সেবা পাওয়ার আশায়। শহরে এমন হার ৯ দশমিক ৭৯ শতাংশ, গ্রামে ৯ দশমিক ৭৫ শতাংশ। আবার কেউ কেউ ঘুষকে কৃতজ্ঞতা হিসেবে দেখেছেন। জরিপে ৩ দশমিক ৪২ শতাংশ উত্তরদাতা বলেছেন, তারা সেবা পাওয়ার পর কর্মকর্তাকে খুশি করতে ঘুষ দিয়েছেন।
দুর্নীতিবিষয়ক এই জরিপের ফলাফল সম্পর্কে জানতে চাইলে ‘সিটিজেন পারসেপশন সার্ভে’র প্রকল্প পরিচালক রাশেদ-ই মাসতাহাব বলেন, “নিরাপত্তা, সুশাসন, সেবার মান, দুর্নীতি ও ন্যায়বিচার—এসব বিষয়ে নাগরিকদের অভিজ্ঞতা জানতে এই জরিপ। এখানে শুধু সেবাগ্রহীতাদের অভিমতই তুলে ধরা হয়েছে।” ঘুষ ও দুর্নীতির অনুসন্ধানে দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থা দুদকের তথ্য বলছে, গত ৫ আগস্ট ২০২৩ থেকে ৩০ জুন ২০২৪ পর্যন্ত তারা ৭৬৮টি অভিযোগ তদন্ত করেছে, যার মধ্যে ৩৯৯টি মামলায় পরিণত হয়েছে। এর বাইরে আরও ১২ হাজার ৮২৭টি অভিযোগ জমা পড়ে দুদকে। গত জানুয়ারিতে একক মাসে সর্বোচ্চ ৭০টি মামলা করা হয়।
এই মামলাগুলোর মধ্যে ক্ষমতার অপব্যবহার, সরকারি প্রকল্পে অনিয়ম, অবৈধ সম্পদ অর্জন, মানি লন্ডারিং, জমি দখল, ভুয়া টেন্ডার ও শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারির মতো গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। এমনকি অনেক কর্মকর্তা বিদেশে অর্থপাচার করে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, মালয়েশিয়া ও ইউএইতে বাড়ি বা ব্যবসা প্রতিষ্ঠান করেছেন বলেও অভিযোগ আছে।
দুদকের মহাপরিচালক (প্রতিরোধ) মো. আক্তার হোসেন বলেন, “সরকারি কর্মকর্তাদের অপরাধকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে দেখা হয়। কারণ, দুদকে যত অভিযোগ আসে তার বেশির ভাগই সরকারি দপ্তরের কর্মকর্তা ও জনপ্রতিনিধিদের বিরুদ্ধে।” বিশ্লেষকদের মতে, সেবার নামে ঘুষ আদায় এক ধরনের প্রতারণা।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজ ও অপরাধ বিশ্লেষক ড. তৌহিদুল হক বলেন, “ঘুষ ছাড়া সরকারি সেবা পাওয়া যাবে না—এই ধারণা নাগরিকদের মধ্যে প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে। অর্থাৎ ঘুষ না দিলে সেবা পাওয়া যায় না কিংবা দেরি হয়। এটি নাগরিক অধিকার লঙ্ঘনের শামিল।” তিনি আরও বলেন, “ঘুষ নেওয়া এখন চর্চায় পরিণত হয়েছে। রাষ্ট্র এটি জেনে-বুঝে সহ্য করছে। তাই শুধু ‘জিরো টলারেন্স’ বললে হবে না, বাস্তবায়ন করতে হবে। স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও সুশাসন না থাকলে দুর্নীতির এই দুষ্টচক্র ভাঙা সম্ভব নয়।”

