মুন্সিগঞ্জের গজারিয়া উপজেলায় ৬০০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্প এখন সরাসরি হুমকির মুখে। মেঘনা নদীর তীরে প্রকল্প রক্ষায় নির্মিত বাঁধ ঘেঁষে ড্রেজার দিয়ে অবৈধভাবে বালু তোলায় বাঁধে ধস দেখা দিয়েছে। ইতিমধ্যে বাঁধের ব্লক ধসে পড়েছে এবং ফাটলও ধরেছে। সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, এভাবে চলতে থাকলে যেকোনো সময় পুরো বাঁধ বিলীন হয়ে যেতে পারে, যা প্রকল্পটির অস্তিত্বই বিপন্ন করে দেবে।
প্রকল্প কর্তৃপক্ষ জানান, তারা বারবার জেলা প্রশাসকসহ সংশ্লিষ্ট প্রশাসনকে চিঠি দিয়েও কোনো কার্যকর পদক্ষেপ পাননি। গত মার্চ থেকে শুরু করে সর্বশেষ ২৯ জুন পর্যন্ত একাধিকবার লিখিতভাবে জানানো হলেও বালু উত্তোলন থামেনি।
প্রকল্পটির নির্বাহী পরিচালক সুসান্ত কুমার সাহা জানান, বাঁধের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে জেলা প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছে। কিন্তু তারপরও বালু তোলার কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।
২০১৬ সালে রুরাল পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেডের আওতায় এই প্রকল্প হাতে নেয় সরকার। প্রাথমিকভাবে ৩৫০ মেগাওয়াটের কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের পরিকল্পনা থাকলেও পরবর্তীতে সেটি রূপান্তর করে গ্যাসভিত্তিক ৬০০ মেগাওয়াট কম্বাইন্ড সাইকেল বিদ্যুৎকেন্দ্রের পরিকল্পনা গৃহীত হয়। গজারিয়ার ইমামপুর ইউনিয়নের ষোলআনি ও দৌলতপুর মৌজায় ২৫৪ একর জমি অধিগ্রহণ করে নদীর তীর বাঁধ নির্মাণ, বালু ভরাটসহ অবকাঠামোগত কার্যক্রমে ৪০০ কোটি টাকা ব্যয় হয়।
গত সোমবার সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, প্রকল্প রক্ষা বাঁধ থেকে মাত্র ৬০-৭০ ফুট দূরত্বে একাধিক ড্রেজার দিয়ে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। উত্তোলিত বালু নদীপথে দেশের বিভিন্ন এলাকায় পাঠানো হচ্ছে। বাঁধের ওপর উঠতেই দেখা যায় ফাটল এবং কিছু অংশে ব্লক ধসে পড়েছে।
স্থানীয়রা জানান, মাসখানেক ধরে বিএনপি, যুবদল ও ছাত্রদল-সম্পৃক্ত একটি সিন্ডিকেট এই বালু উত্তোলনে যুক্ত। এদের সঙ্গে অস্ত্রধারী লোকজন থাকায় কেউ প্রতিবাদ করার সাহস পাচ্ছেন না।
প্রকল্পের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বাঁধের চারপাশে বড় বড় কংক্রিটের ব্লক দেওয়া হয়েছিল। নদীর তীর থেকে অন্তত ১০০ ফুট দূর পর্যন্ত এসব ব্লক বসানো হয় যাতে প্রাকৃতিক দুর্যোগেও প্রকল্পে কোনো ক্ষতি না হয়। অথচ এখন সেই অবকাঠামোই ধ্বংসের মুখে।
জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, চলতি অর্থবছরে মুন্সিগঞ্জ জেলার নয়ানগর, রমজানবেগ, চরকালীপুরা ও ষোলআনি মৌজায় ১২৮ একর নদীতে বালু উত্তোলনের জন্য আদন ড্রেজিং লিমিটেড নামক প্রতিষ্ঠানকে ইজারা দেওয়া হয়। প্রতিষ্ঠানটি ২৬ কোটি ২৫ লাখ টাকায় এই ইজারা লাভ করে। তবে শর্ত অনুযায়ী নদীর তীর থেকে ৮০০ থেকে ১০০০ ফুট গভীর এলাকা থেকে বালু তোলার অনুমতি ছিল তাদের। অথচ তারা নির্ধারিত সীমার বাইরেও উত্তোলন করছে।
জানা গেছে, ইজারাপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানটির মালিক মিয়া নুরুদ্দিন অপু। তাঁর বড় বোন সেলিনা আক্তার হলেও প্রকৃতপক্ষে স্থানীয় বিএনপি নেতাদের দিয়ে কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। অপু ও স্থানীয়ভাবে সাবেক যুবদল নেতা মুজিবুর রহমান এবং জেলা ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি আমিনুল ইসলাম বালুমহালের দেখভাল করছেন।
ফোনে যোগাযোগ করা হলে আমিনুল ইসলাম এ কার্যক্রম পরিচালনার কথা স্বীকার করেন। তিনি দাবি করেন, তাঁরা নদীর ৬০০ ফুট গভীর থেকে বালু উত্তোলন করছেন। তবে স্থানীয়দের ভাষ্য, তারা প্রকল্পের বাঁধ ঘেঁষে মাত্র ৬০-৭০ ফুট দূর থেকেই বালু তুলছেন।
অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধে কিছুদিন আগে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে অভিযান চালানো হয় বলে জানান জেলা প্রশাসক ফাতেমাতুল জান্নাত। তিনি বলেন, ‘ইজারা সীমানা অতিক্রম করে কেউ বালু তুললে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
সংশ্লিষ্ট মহলের অভিযোগ, রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়া ও প্রশাসনিক নিষ্ক্রিয়তার সুযোগে রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ বিদ্যুৎ প্রকল্প এখন মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে। যদি এখনই কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়া হয়, তবে কয়েক শ কোটি টাকার রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

