দেশের ব্যাংকিং খাতে যখন ভুয়া ঋণের বেপরোয়া দাপট, তখন প্রিমিয়ার ব্যাংক থেকে আরেকটি চাতুর্যপূর্ণ ও জটিল পন্থায় কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করার অভিযোগ উঠেছে। অভিযুক্ত ব্যক্তি ব্যাংকটির প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান এবং সাবেক সংসদ সদস্য এইচবিএম ইকবাল।
সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকের এক পরিদর্শনে উঠে এসেছে, কীভাবে ইকবাল তার পরিবারের ব্যবসা ও সম্পত্তির জন্য প্রিমিয়ার ব্যাংককে ব্যক্তিগত অর্থভাণ্ডারের মতো ব্যবহার করেছেন। অথচ একই সময়ে ব্যাংকটির খেলাপি ঋণ বিপজ্জনকভাবে বেড়ে গেছে।
নিজের ব্যাংকেই ‘ইকবাল সেন্টার’ ভাড়া দিয়ে আয়
ভুয়া প্রতিষ্ঠানের নামে ঋণ নয়—ইকবালের কৌশল ছিল অনেক বেশি সূক্ষ্ম। তিনি নিজের মালিকানাধীন বনানীর ‘ইকবাল সেন্টার’ ব্যাংকের কাছে ভাড়া দিয়েছেন। এটি ছিল প্রিমিয়ার ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালে নতুন চুক্তি হওয়ার পর থেকে প্রতিষ্ঠানটি বছরে গড়ে ৬০ কোটি টাকা অতিরিক্ত ভাড়া দিয়েছে।
তুলনা করতে গেলে, একই এলাকায় অবস্থিত এসএমসি টাওয়ারের অফিস স্পেসের ভাড়া প্রতি বর্গফুটে ১৩০ টাকা। অথচ প্রিমিয়ার ব্যাংক দিয়েছে ৪৪০ থেকে ৪৬২ টাকা।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রতি বর্গফুট ভাড়া যদি বাজারমূল্য ১০০ টাকা ধরা হয়, তাহলে অতিরিক্ত ব্যয় বছরে দাঁড়ায় ৬১.৫৩ কোটি টাকা।
এমনকি ‘ইকবাল সেন্টার’-এর দুটি ফ্লোর (২০ ও ২১ তলা), যেগুলোর নির্মাণই সম্পন্ন হয়নি—সেগুলোর জন্যও ভাড়া দেওয়া হয়েছে। গত ৪২ মাসে সেখানে ব্যয় হয়েছে প্রায় ২৭ কোটি টাকা।
সরেজমিন পরিদর্শনে দেখা গেছে, ওই ফ্লোরগুলোতে কেবল ছাদ রয়েছে, কিন্তু কোনো দেয়াল, বৈদ্যুতিক সংযোগ, স্যানিটারি ব্যবস্থা নেই। তারপরও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনুমোদন নিয়ে ভাড়া পরিশোধ করেছে প্রিমিয়ার ব্যাংক।
অগ্রিম ভাড়ার হিসাবেও প্রিমিয়ার ব্যাংক ইকবালের প্রতিষ্ঠানের কাছে দিয়েছে প্রায় ২২০ কোটি টাকা, যা আগের বছরের সমন্বিত অগ্রিম ভাড়ার (১৫৯.৩২ কোটি টাকা) চেয়েও অনেক বেশি। এতে চুক্তি লঙ্ঘনের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
ব্যক্তিগত মালিকানাধীন জায়গায় ব্যাংকের গুদাম, অপ্রয়োজনীয় খরচ
সাবেক চেয়ারম্যানের ছেলে মঈন ইকবালের মালিকানাধীন তেজগাঁও শিল্প এলাকায় ২৫ হাজার বর্গফুটের একটি টিনশেড গুদাম ভাড়া নিয়েছে ব্যাংকটি। বার্ষিক ভাড়া ৩.৭৫ কোটি টাকা। অথচ গুদামের এক-চতুর্থাংশও ব্যবহার করা হচ্ছে না।
অথচ ব্যাংকটির বনানীর নিজস্ব জমিতে স্থাপনা তৈরি করলে খরচ অনেক কম হতো।
স্ত্রী ও পরিবারের সম্পত্তিতেও ভাড়া বাণিজ্য
ইকবালের স্ত্রীর মালিকানাধীন ‘প্রিমিয়ার স্কয়ার’ থেকে ব্যাংকের সাবসিডিয়ারি প্রতিষ্ঠান প্রিমিয়ার ব্যাংক সিকিউরিটিজ লিমিটেড (পিবিএসএল) গুলশান শাখার জন্য ১০ হাজার ৪০০ বর্গফুট ভাড়া নিয়েছে।
পরিদর্শনে দেখা গেছে, ব্যবহার হচ্ছে মাত্র ৫১০ বর্গফুট। বাকি অংশ ব্যবহৃত হচ্ছে ইকবালের ব্যক্তিগত চেম্বার, একটি হোটেলের কনফারেন্স রুম ও গোডাউন হিসেবে।
প্রিমিয়ার ব্যাংক পিবিএসএল-কে দিয়েছে ২৩০.২০ কোটি টাকা ঋণ, যার মধ্যে ১০৬.৫৮ কোটি টাকার কোনো রেকর্ড নেই। এই ঋণের সুদহারও অস্বাভাবিকভাবে কম—মাত্র ৫ শতাংশ।
‘দান-খয়রাতের’ নামে ফাউন্ডেশন ঘিরেও প্রশ্ন
প্রিমিয়ার ব্যাংক ফাউন্ডেশনে বার্ষিক মুনাফার ১ শতাংশ বা ১ কোটি টাকার বেশি অনুদান দেওয়ার নিয়ম থাকলেও, পরিচালনা পর্ষদের অনুমোদন ছাড়াই ২০২৩ সালে ৩০ কোটি এবং ২০২৪ সালে আরও ৫ কোটি টাকা দেওয়া হয়েছে।
এই অর্থ ব্যয় করা হয়েছে ইকবাল পরিবারের নিয়ন্ত্রণাধীন প্রতিষ্ঠান—রয়েল ইউনিভার্সিটি অব ঢাকা, জেড রহমান স্কুল অ্যান্ড কলেজ এবং শেখ হাসিনা ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজিতে।
ফলে আমানতকারী ও শেয়ারহোল্ডারদের স্বার্থ মারাত্মকভাবে উপেক্ষিত হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের এক কর্মকর্তা জানান, কোনো ব্যাংক যদি পরিচালকের কাছ থেকে ভাড়া নিতে চায়, তাহলে অনুমোদন নিতে হয়। তিনি বলেন, “এইচবিএম ইকবালের প্রভাবের কারণে পূর্বে বাধ্য হয়ে অনুমোদন দিতে হয়েছে। এখন এসব অনিয়ম ধরা পড়ায় আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
২০২৫ সালের মার্চ শেষে প্রিমিয়ার ব্যাংকের খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় ৯ হাজার ৮১৭ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ২৯ শতাংশ। অথচ ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে এই অঙ্ক ছিল মাত্র ১ হাজার ৬১১ কোটি টাকা।
বর্তমানে ব্যাংকটির প্রভিশন ঘাটতি রয়েছে ৭ হাজার ১৬ কোটি টাকা।
পদত্যাগ, নিষেধাজ্ঞা ও তদন্ত
স্বাস্থ্যগত কারণ দেখিয়ে এইচবিএম ইকবাল ও তার ছেলে মঈন ইকবাল ২০২৫ সালের ১২ জানুয়ারি পদত্যাগ করেন। চেয়ারের দায়িত্ব নেন তার আরেক ছেলে ইমরান ইকবাল।
দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ইতোমধ্যে এইচবিএম ইকবালের বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জন ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে তদন্ত শুরু করেছে।
তাদের বিদেশযাত্রায় আদালত নিষেধাজ্ঞা জারি করলেও, বর্তমানে ইকবাল ও তার স্ত্রী বিদেশে রয়েছেন। গত নভেম্বরেই তাদের ব্যাংক হিসাব জব্দ করা হয়।
প্রতিবেদক প্রিমিয়ার ব্যাংকের বর্তমান চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালকের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করলেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। ২৩ জুলাই ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে গিয়েও কর্মকর্তাদের পক্ষ থেকে কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।

